অনুধ্যান পদ্ধতি কাকে বলে? ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা কর।

অথবা, সমাজ মনোবিজ্ঞানে ঘটনা অনুখ্যান পদ্ধতি বিস্তারিত আলোচনা কর।

উত্তর: 

ভূমিকা: সামাজিক সমস্যা উল্লেখ ও বিকাশধারা জানার জন্য সামাজিক, চিকিৎসা ও আচরণ বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতির প্রধান লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট সমস্যার স্বরূপ উন্মোচন করে তার সুষ্ঠু সমাধান পরিকল্পনায় সম্যক সহায়তা করা। এ কারণে তুলনামূলক আচরণ, চিকিৎসা ও সমাজ বিষয়ে প্রায়োগিক প্রয়োজনে এর ব্যবহার যথেষ্ট সমাদর লাভ করেছে।

ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি : বিজ্ঞানী বিভিন্ন ঘটনায় ঘটনার অনুধ্যান পদ্ধতির স্বরূপ সম্পর্কে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেন। কারো কারো মতে এটি সমাজ গবেষণার একটি পদ্ধতি। কেউ কেউ একে গবেষণার কৌশল, বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ইত্যাদি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

The Social work Dictionary ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি সম্পর্কে উল্লেখ করে যে, “A method of evaluation by examining systematically many. Characteristics of one individual, group, or community usually over an extended period.” আবার অনেকে মনে করেন, ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি হলো এক ধরনের জীবন বৃত্তান্ত পদ্ধতি। ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে ধারণা লাভ করার কৌশলকে ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি বলে। এপদ্ধতির লক্ষ্য হলো মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরকে বুঝতে পারা ও তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা। মানসিক রোগীদের সমস্যাগুলো বর্ণনা, বিভিন্ন অসুবিধার ক্ষেত্রে রোগীকে কিভাবে সহায়তা করা যায় ইত্যাদি বিষয় রেখে গবেষকগণ এ পদ্ধতিতে কাজ করেন। তাছাড়া মনোবিজ্ঞানীগণ জানতে চান এসব সমস্যা কিভাবে রোগীর মধ্যে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এজন্য মনোবিজ্ঞানীগণ ব্যক্তির শৈশবকাল, পরিবার, স্কুল জীবন, সখ, ভালবাসার সম্পর্ক, প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতিতে মনোবিজ্ঞানীগণ যেসব তথ্য সংগ্রহে সচেষ্ট থাকেন তা হলো:

১. ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, লিঙ্গ, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান, বয়স, ধর্ম ইত্যাদি।

২. যে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে তার বর্ণনা।

৩. পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও অন্যান্যদের প্রতি মনোভাব।

৪. আর্থ-সামাজিক অবস্থা।

৫. পারিবারিক শিক্ষার মান।

৬. স্বাস্থ্য বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের বর্ণনা।

৭. পারিবারিক আদর্শের সাথে ব্যক্তির আদর্শের মধ্যে কোনো প্রকার দ্বন্দ্ব আছে কিনা।

৮. মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশ।

৯. ব্যক্তিত্বের ধরন।

১০. বুদ্ধির ক্রমবিকাশ।

১১. সামাজিক বিকাশ।

১২. আর্থিক সংগতি বিধান।

১৩. পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি

১৪. যৌনতা

১৫. বিশেষ পছন্দ ও অপছন্দের বিষয় ইত্যাদি। ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতিতে একটি এককের ক্ষুদ্র, সর্বাত্মক ও গভীর দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়। সামাজিক কোনো একককে অনুসন্ধান করাই হলো ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি ।

ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য : এ পদ্ধতির কতিপয় বৈশিষ্ট্য হলো –

১. ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি হলো গবেষণার বর্ণনামূলক উদঘাটনের অনুসন্ধানমূলক একটি কৌশল।

২. এক বা কতিপয় ব্যক্তি দল, সমষ্টি, প্রতিষ্ঠান, ঘটনা ও অবস্থানকে একক হিসেবে বিবেচনা করে।

৩. একক সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় সম্পর্কে গভীর ও বিস্তৃতি পরিচিতি লাভ ও ব্যাখ্যায় সচেষ্ট থাকে।

৪. এটি নমনীয় প্রকৃতির অনুসন্ধান পদ্ধতি।

৫. এ পদ্ধতি সমস্যা সমাধানে অধিক মাত্রায় প্রয়োগমুখী।

৬. ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি সম্পূর্ণ সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ ।

৭. এটি গুণাত্মক অনুসন্ধান পদ্ধতি ।

ঘটনা অনুধ্যান সুবিধা : ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতির কতিপয় সুবিধা:

১. বিভিন্ন ব্যক্তি, দল, অবস্থা, বিষয়, প্রতিষ্ঠান, অনুষ্ঠান সম্পর্কে গভীর ও বিস্তৃত ধারণা লাভ করা যায়।

২. নির্দিষ্ট সমস্যার প্রকৃতি, গভীরতা এবং এর উন্মেষ ও বিকাশ সম্পর্কিত বিষয়াদি খুঁজে পাওয়া যায় ।

৩. এ পদ্ধতিতে একের ব্যক্তিত্ব, আবেগ, মানসিকতা, ইত্যাদি সম্পর্কে জানা যায় ।

৪. এটি নমুনায়নে সহায়তা দান করে।

৫. এর মাধ্যমে একক সম্পর্কে নতুন ধারণা-অন্তর্দৃষ্টি ও নির্দেশনা পাওয়া যায়।

৬. এর ফলে পরবর্তী গবেষণার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়

৭. এটি সংগ্রহের উপযুক্ত কৌশল তৈরিতে সাহায্য করে।

৮. এটি প্রকল্প গঠনে সহায়ক।

ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতির অসুবিধা : নিম্নে ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতির কতিপয় অসুবিধা তুলে ধরা হলো।

১. এ পদ্ধতিতে অপ্রাসঙ্গিক ও অতিমাত্রায় আত্মনিষ্ঠ এবং পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য সংগ্রহের সম্ভাবনা থাকে।

২. এতে সাধারণীকরণ ও তুলনাকরণের কোন সুযোগ নেই।

৩. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ধারণা কম থাকায় গবেষকের ভ্রান্ত ধারণা লক্ষ করা যায়।

৪. এ পদ্ধতিতে দক্ষ, অভিজ্ঞ গবেষকের অভাব, তাছাড়া প্রয়োজনীয় উপকরণ সব সময় পাওয়া যায় না।

৫. প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ পদ্ধতিতে কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয় ও সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিমাপ সম্ভব নয়।

৬. প্রাপ্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা কঠিন কাজ। ফলে এটি কম নির্ভরযোগ্য।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সমাজ মনোবিজ্ঞান গবেষণায় ঘটনা অনুধ্যান পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পদ্ধতিতে ঘটনার একক সংশ্লিষ্ট, ব্যক্তি বস্তু, বিষয়, অবস্থা, সম্পর্ক ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। এজন্য বিজ্ঞানীগণ একে তথ্য সংগ্রহের একটি পদ্ধতি আবার কখনো তথ্য সংগ্রহের একটি কৌশল বলে আখ্যায়িত করে। সেই কথা সামাজিক গবেষণায় এ পদ্ধতিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *