কিভাবে সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে আলোচনা কর।

সংস্কৃতির পরিবর্তন

অথবা, সংস্কৃতির পরিবর্তন কিভাবে ঘটে? বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মানুষের জীবন প্রণালি তার সংস্কৃতি প্রাচীনকাল থেকে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। সমাজে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তাদের চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে নিজস্ব কলাকৌশল ও চিন্তাচেতনা দ্বারা যা কিছু সৃষ্টি করে তার মাধ্যমে তাদের আদর্শ, মূল্যবোধ, শিল্প, নীতিবোধ, বিশ্বাস ইত্যাদির প্রকাশ ঘটে। তাই সংস্কৃতি হলো সমাজবদ্ধ মানুষের বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিচয়ের অর্থবহ উপাদান। আদিম সমাজ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সভ্যতার উৎকর্ষ ও বিকাশসাধনে সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মূলত সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষ তার সমাজবদ্ধ জীবনকে সুন্দর, সার্থক ও গতিশীল করে গড়ে তুলতে পারে ।

সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধরন : বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে সংস্কৃতি গঠিত। আর এই উপাদানগুলোর পরিবর্তনের কারণে সংস্কৃতি পরিবর্তন ঘটে। নিম্নে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক বা উপাদানগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. ঐতিহাসিক উপাদান : প্রত্যেক সমাজে বিভিন্ন প্রথা প্রচলিত থাকে যেগুলো সংস্কৃতির অংশ। আর এই প্রথাগুলো মূলত কোন বিশেষ সময়কে কেন্দ্র করে প্রচলিত হয়েছে। এই ধরনের প্রথার উদ্ভবের পিছনে কোন গোষ্ঠী বা ব্যক্তির অসতর্কমূলক আচরণ দায়ী। যার কারণে এ সমাজের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং তারা সেটা পালন করা শুরু করে। আর এই প্রথাকে ঘিরে ঐ সমাজের সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়।

২. ভৌগোলিক অবস্থানগত তারতম্য : পৃথিবীতে ভৌগোলিক অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে একেক অঞ্চলে একেক ধরনের সংস্কৃতির প্রচলন দেখা যায়। প্রতিটি অঞ্চলের অধিবাসীরা তাদের স্ব স্ব উপাদান দ্বারা তাদের সংস্কৃতি গড়ে তোলে। যেমন বলা যায় শীত প্রধান দেশের পোশাক পরিচ্ছদ এবং গ্রীষ্ম প্রধান দেশের মানুষের পোশাকে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। আবার আমাদের দেশের খাদ্যাভ্যাস ও চলাফেরা এবং পশ্চিমা সমাজের খাদ্যাভ্যাস ও চলাফেরায় ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

৩. সামাজিকীকরণে গতিশীলতা : সমাজে ব্যক্তির সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে যেমন গতিশীলতা লক্ষ্য করা যায় তেমনি সংস্কৃতিরও গতিশীলতা লক্ষ্য করা যায়। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি মানব শিশু সমাজে প্রত্যক্ষ সদস্য হয়ে উঠে। এর মাধ্যমে তার চিন্তা চেতনা, মূল্যবোধ ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটে। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। মূলত সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার উপর সামাজিক পরিবর্তন নির্ভর করে।

Also Read-

৪. সভ্যতার পরিবর্তন: সভ্যতা মূলত মানব সমাজের উন্নততর অবস্থা। মানুষ যে অবস্থানে ছিল তা থেকে উন্নত অবস্থা বোঝাতে সভ্যতা ব্যবহার করা হয়। সভ্যতার সাথে সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। সভ্যতার বিকাশ বা পরিবর্তনের প্রভাব সংস্কৃতির উপর ব্যাপকভাবে পড়ে। সভ্যতার পরিবর্তনের ফলে সংস্কৃতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সুতরাং বলা যায় সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের অন্যতম নিয়ামক হলো সভ্যতার পরিবর্তন। আদিম যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিভিন্ন সভ্যতার বিলোপ ও বিকাশ সাধন হয়েছে। এর সাথে সাথে সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। আদিম যুগের সাংস্কৃতিক অবস্থা বর্তমান যুগে মানুষ কল্পনা করতে পারে না। এভাবে রীতিনীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেছে।

৫. ব্যক্তি মানুষের ইচ্ছা : সমাজ সংস্কৃতি মূলত ব্যক্তি মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছা সংস্কৃতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ফেজ টুপির পরিবর্তে জিন্নাহ টুপির প্রচলন। আর এভাবে ভারতবর্ষে প্রচলিত হয়েছে গান্ধি টুপির। আবার অনেক সময় সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সক্রিয় উদ্যোগ আয়োজনের মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে আচার ব্যবহার এর ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারার পরিবর্তন হতে পারে। যার প্রভাব সংস্কৃতির উপর ব্যাপকভাবে পড়ে।

৬. জৈব পরিবর্তন : সমাজ জীবনে মানুষের জৈব পরিবর্তন অনস্বীকার্য। মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে এই পরিবর্তন ঘটে। আর এই জৈব পরিবর্তনের ফলে মানুষের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও ঘটে। মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে তার প্রতিবেশ, গোষ্ঠী এবং প্রস্তাবিত পরিবেশের সাথে সংযোগ রেখে চলতে হয়। আর এই প্রক্রিয়া নিয়মিত চলতে থাকে। আর এই জৈব পরিবর্তন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

৮. প্রাধান্য সৃষ্টিকারী সাংস্কৃতিক বিষয়াদির ভিন্নতা : বিশ্বের প্রতিটি সমাজের সংস্কৃতির একটি মুখ্য বা কেন্দ্রীয় বিষয় থাকে। আর এই উপাদানটি সংস্কৃতির প্রাধান্য বিস্তারকারী উপাদান হিসেবে বিবেচিত। যেমন- জাতীয় সমাজ ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় মুখ্য বিষয় হলো পুরুষের প্রাধান্য। আবার পশ্চিমা সমাজের মুখ্য বিষয় হলো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ। চীনের সংস্কৃতির কেন্দ্রীয় বিষয় হলো মার্কসবাদ। তবে প্রত্যেক সমাজের প্রাধান্য বিস্তারকারী উপাদানটি পরিবর্তনশীল, স্থিতিশীল নয়। তাই সংস্কৃতি স্থান, কাল ভেদে পরিবর্তন হয়। সনাতন.

 সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে উন্নত সমাজ ব্যবস্থায় পৌঁছলে সমাজে নতুন বিষয় প্রাধান্য বিস্তার করে এবং সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে।

৯. বিভিন্ন আবিষ্কার বা উদ্ভাবন : আধুনিক যুগে জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে বিভিন্ন কলা কৌশল প্রয়োগ করে নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করা যাচ্ছে। যার দ্বারা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভাবে মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য, ধ্যান-ধারণা, প্রথা প্রভৃতির ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। প্রকৃতপক্ষে কোন নতুন বিষয় বা আবিষ্কার সংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন করতে পারে।

১০. উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তন : কোন সমাজের সংস্কৃতির সাথে ঐ সমাজের উৎপাদন পদ্ধতির ব্যাপক সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। মার্কসীয় দর্শন অনুসারে উৎপাদন পদ্ধতিই হলো কোন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মুখ্য নির্ধারক। তার দর্শন অনুসারে সমকালীন উৎপাদন পদ্ধতির পরিপ্রেক্ষিতে স্থির/নির্ধারণ হয় একটি জনগোষ্ঠীর ন্যায়নীতিবোধ, আইন ব্যবস্থা, প্রথা, সাহিত্য প্রভৃতি। মূলত উৎপাদন পদ্ধতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটলে সংস্কৃতির পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সংস্কৃতি হলো কোন সমাজের সমাজবদ্ধ মানুষের বাস্তব পরিচিতি। সমাজবদ্ধ মানুষের কার্যকর নিয়ন্ত্রক হলো তার সংস্কৃতি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ভিন্ন ধরনের। প্রত্যেক সমাজের আলাদা আলাদা প্রয়োজন থাকার কারণে তাদের সংস্কৃতি ভিন্ন হয়। আর এই সামাজিক উপাদানগুলোর ভিন্নতার কারণে সাংস্কৃতিক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *