পরীক্ষণের শ্রেণিকরণ, সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ, ধাপসমূহ আলোচনা কর।

পরীক্ষণের শ্রেণিকরণ লিখ। পরীক্ষণে কার্যকারণ সম্বন্ধের স্বরূপ ও সম্পর্ক নির্ণয় বা শর্তাবলী ব্যাখ্যা কর।
অথবা, পরীক্ষণের ধ্রুন বা শ্রেণিকরণ আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : পরীক্ষণ হলো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কোনোকিছু পর্যবেক্ষণ করা। সমাজবিজ্ঞানী Green wood-এর মতে, “As a method or testing hypothesis”। যোধা ও অন্যান্যের মতে, “পরীক্ষণ হলো প্রমাণাদি সংগ্রহের একটি সুসংবদ্ধ উপায়, যার মাধ্যমে কোনো অনুকল্প যাচাই করা হয়।”

পরীক্ষণের ধরন বা শ্রেণীকরণ : পরীক্ষণের প্রকৃতি ও নিয়ন্ত্রণের মাত্রার উপর পরীক্ষণ পদ্ধতির বিভিন্ন ধরন নির্ভর করে । Green wood নিম্নোক্ত শ্রেণীর পরীক্ষণ পদ্ধতির উল্লেখ করেছেন

১. প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংশোধন : এটি পরীক্ষণের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই অনুষ্ঠিত হয়। এক্ষেত্রে গবেষক কোনো কাঠামোবদ্ধ গবেষণা বা অনুধ্যান পরিকল্পনা তৈরি না করে কেবল একটি অনুকল্প তৈরি করেন এবং সামাজিক বিভিন্ন শর্তে তা পরীক্ষা করার চেষ্টা করেন। যেহেতু তার অনুধ্যান কোনো নির্দিষ্ট নয়, তাই অভিজ্ঞতার আলোকে তা পরিবর্তন করা হয়।

২. নিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণীয় অনুধ্যান : এখানে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং এটিকে প্রায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষণ বলা হয় ।

3.Ex-post-facto technique : এ পদ্ধতিটি সাধারণত সমবৈশিষ্ট্যপূর্ণ দুটি ঘটনার মধ্যে বিভিন্ন প্রভাব কিভাবে ভিন্ন হয় তা জানার জন্য ব্যবহৃত হয়।

৪. প্রাকৃতিক পরীক্ষণ : এ ধরনের পরীক্ষণ ব্যাপক কৌশলকে অন্তর্ভুক্ত করে। যেমন- প্রচারণার কৌশল, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পদ্ধতি । দলীয় সিদ্ধান্ত ও অংশগ্রহণ ইত্যাদি।

৫. গবেষণাগার পরীক্ষণ : এক্ষেত্রে গবেষক যা চান ঠিক সে ধরনের পরিবেশ বা অবস্থান তিনি তৈরি করেন এবং ক্ষেত্রে কিছু চলককে তিনি নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করেন আবার কিছুকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিবর্তন করেন। 

পরীক্ষণে কার্য-কারণ সম্বন্ধের স্বরূপ ও সম্পর্ক নির্ণয়ক শর্তাবলি : পরীক্ষণমূলক গবেষণায় মূলত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কার্যকারণ সম্বন্ধযুক্ত একটি অনুকল্প যাচাই করা হয়। একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ‘X’ সৃষ্টির অন্যতম উপাদান হলো অন্য একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ‘y’ বিজ্ঞানে কার্য-কারণ সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। কার্য-কারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কারণ বলতে এমন একটি ঘটনাকে (x) বুঝানো হয়। যা অন্য একটি ঘটনা (y) ঘটাতে সাহায্য করে। পরীক্ষণের মূল লক্ষ হলো সংঘটিত কোনো ঘটনার ‘Immediate cause’ চিহ্নিত করা। পরীক্ষণে কোন একটি ঘটনার ক্ষেত্রে যেসব শর্ত থাকে এবং সেসব শর্ত কিভাবে কাজ করে তা বিজ্ঞানীরা খোঁজে বের করতে আগ্রহী। নিম্নে সেসব শর্ত সম্পর্কে আলোচিত হলো :

১. আবশ্যকীয় শর্ত : এটি এমন একটি শর্ত, যা নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটালে সেখানে অবশ্যম্ভাবী রূপে উপস্থিত থাকে। যেমন- শ্রমিকরা শ্রমিক অসন্তোষের একটি আবশ্যকীয় শর্ত।

২. পর্যাপ্ত শর্ত : এটি এমন একটি শর্তকে বুঝায় যা একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটাতে সক্ষম। যেমন- অপটিক (Optic) নার্ভ নষ্ট হয়ে গেলে অবশ্যই অন্ধত্ব ঘটবে।

৩. সহায়ক শর্ত : এটি এমন একটি শর্ত যা কোনো একটি ঘটনা ঘটাতে যে শর্তের দরকার হয় তাকে সাহায্য করে। যেমন- কৈশোরে পরিবারে পিতার অনুপস্থিতি, (দৈহিক) অনুপস্থিতির ফলে সন্তানের মাঝে মাদকাসক্তি সৃষ্টিতে সাহায়ক ভূমিকা পালন করে।

৪. আকস্মিক শর্ত : এটি এমন একটি বিষয়, যা কোনো চলককে সহায়ক শর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে সাহায্য করে। যেমন- মাদকাসক্তির জন্য শুধু পিতার দৈহিক অনুপস্থিতি নয় সঙ্গীরাও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

৫. বিকল্প শর্ত : এটি হচ্ছে এমন সব অবস্থা, যা সম্মিলিতভাবে ঘটনা ঘটাতে সহায়তা করে। যেমন- মাদকাসি সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন কারণ দায়ী যা বিকল্প শর্ত হিসেবে অনুমিত।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় কার্য-কারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঠিক কারণ বা শর্তটি সংশ্লিষ্ট কার্যের আবশ্যকীয় ও পর্যাপ্ত শর্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও তা অন্যান্য শর্তের প্রভাব মুক্ত হতে পারে না। তাই কোন কার্যের সঠিক কারণ নির্ধারণ কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়া ।

 

পরীক্ষণ পদ্ধতির ধাপসমূহ ধারাবাহিকভাবে আলোচনা কর।

অথবা, পরীক্ষণ পদ্ধতির ধাপসমূহ কি কি? বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : কোনোকিছু করার পূর্বে যদি ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্পর্কে পরিকল্পনা নির্ধারণ করে নেয়া যায় তাহলে ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে লক্ষ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়া যায়। মনোবিজ্ঞানীগণ তাই কোনো পরীক্ষণ শুরু করার পূর্বে ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সম্বন্ধে একটি পরিকল্পনা ঠিক করে নেন এবং সেই অনুযায়ী পরীক্ষণের সবগুলি ধাপ সম্পন্ন করেন।

পরীক্ষণ পদ্ধতির ধাপসমূহ : কোনো পরীক্ষণকার্য পরিচালনা করতে হলে তা কয়েকটি ধাপে পর্যায় ক্রমে সুসম্পন্ন করতে হয়। নিম্নে পরীক্ষণের ধাপসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. সমস্যা শনাক্তকরণ : পরীক্ষণের প্রথম ধাপ হলো সমস্যা শনাক্ত করা। সমস্যা স্থির করার পরই মূলত পরীক্ষণ কার্য শুরু করা হয়। কোনো বিষয়ের জ্ঞানের অভাব থেকেই সমস্যার সৃষ্টি হয়।

২. প্রকল্প প্রণয়ন : কোনো পরীক্ষণ পরিচালনা করার পূর্বেই উক্ত পরীক্ষণের সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে একটা আনুমানিক ধারণা ঠিক করা হয়। এই আনুমানিক ধারণাই হলো প্রকল্প।

৩. ধারণা গঠন: সমস্যা ও প্রকল্প ঠিক করার পর ঐ সমস্যা ও প্রকল্পে যেসব শব্দ বা পদ ব্যবহার করা হয়েছে সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

৪. চল শনাক্তকরণ : চল শনাক্তকরণ পরীক্ষণ পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পরীক্ষণে সাধারণত নির্ভরশীল চলের উপর অনির্ভরশীল চলের প্রভাব লক্ষ করা হয় এবং অন্তবর্তী চল ও বাহ্যিক চলকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

৫. চলসমূহের নিয়ন্ত্রণ: চল শনাক্ত করার পরবর্তী কাজ হলো যেসব বাহ্যিক চল নির্ভরশীল চলের উপর প্রভাববিস্তার করে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অপসারণ, ভারসাম্য সৃষ্টি, দৈবচয়ন প্রভৃতি পদ্ধতির সাহায্যেঅবাঞ্চিত চল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

৬. পরীক্ষণ পাত্র নির্বাচন ও বিভিন্ন দলে বণ্টন : পরীক্ষণ পদ্ধতির একটি প্রয়োজনীয় ধাপ হলো পরীক্ষণ পাত্র নির্বাচন। কোনো পরীক্ষণে একজন পরীক্ষণ পাত্রের প্রয়োজন হয় আবার কখনো একাধিক, একাধিক পরীক্ষণ পাত্রের ক্ষেত্রে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে তাদের দুটি দলে ভাগ করা হয়- 

১. পরীক্ষণ দল ও 

২. নিয়ন্ত্রিত দল।

৭. পরীক্ষণের নকশা প্রণয়ন : পরীক্ষণটি সম্পন্ন করার জন্য যে পরিকল্পনা নেয়া হয়, তা ছকের আকারে উপস্থাপন করতে হবে। ছকটি এমন হতে হবে যেন তা দেখলেই বোঝা যায় যে, অনির্ভরশীল চলের প্রয়োগ, নির্ভরশীল চলের পরিমাপ, পরীক্ষণে প্রচেষ্টা সংখ্যা ইত্যাদি কিরূপ হবে। অর্থাৎ নকশা থেকে পরীক্ষণটি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়।

৮. যন্ত্রপাতির তালিকা তৈরিকরণ : পরীক্ষণকার্যে বিভিন্ন ধরনের, যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হতে পারে । যে পরীক্ষণ করা হচ্ছে তাতে কি কি যন্ত্র ব্যবহার করা হবে তাই একটি তালিকা প্রণয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

৯. উপাত্ত সংগ্রহ : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ হলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে উপাত্ত সংগ্রহ করা এবং তার যথার্থ ব্যাখ্যা প্রদান করা। এখানে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপাত্ত সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

১০. উপাত্তের পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণ : উপাত্ত সংগ্রহের পর তার যথাযথ ব্যাখ্যা করা হয়। প্রয়োজনে তথ্য বিশ্লেষণের জন্য পরিসংখ্যানের সাহায্য নিয়ে উপাত্তকে অর্থপূর্ণ ও যথার্থ করা হয়। ফলাফল গড়, মধ্যমা, প্রচুরক ইত্যাদি পরিসংখ্যানিক পরিমাপের সাহায্যে বিশ্লেষণ করা যায়।

১১. সাধারণ নিয়ম প্রণয়ন : পরীক্ষণ পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সাধারণীকরণ। পরীক্ষণে যে প্রকল্প স্থির করা হয়েছে তার সাথে যদি প্রাপ্ত ফলাফলের মিল পাওয়া যায় বা অনুরূপ হয় তাহলে প্রাপ্ত তথ্য সম্পর্কে একটি সাধারণ নিয়ম প্রতিষ্টা করা যায়।

১২. যথার্থতা প্রমাণ : পরীক্ষণ পদ্ধতির সর্বশেষ ধাপ হলো যথার্থতা প্রমাণ করা। কোনো একটি পরীক্ষণ পরিচালনার পর তার ফলাফলের ভিত্তিতে যে সাধারণ নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয় তার যথার্থতা যাচাই করা খুব প্রয়োজন ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, যেকোনো বিষয়েরই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেতে হলে একটি নিয়ম বা ধাপ অনুসারে যেতে হয়। তেমনি মনোবিজ্ঞানের পরীক্ষণ পদ্ধতিতে ফলাফল লাভের জন্য ধাপ অনুসারে অগ্রসর হতে হয়। যা অধিক ফলপ্রসূও হয়।

 

পরীক্ষণ পদ্ধতি বলতে কি বোঝ? পরীক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ আলোচনা কর।

অথবা, পরীক্ষণ পদ্ধতির উপকারিতা এবং অপকারিতা বর্ণনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞান কতগুলো পদ্ধতির মাধ্যমে উপাত্ত সংগ্রহ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে। মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো পরীক্ষণ পদ্ধতি । মনোবিজ্ঞানী ওয়াটসন সর্বপ্রথম মনোবিজ্ঞানে পরীক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। প্রতিটা বিজ্ঞানই তার বিষয়বস্তু আলোচনা করার জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে। বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানও এর ব্যতিক্রম নয়। আচরণ সম্পর্কিত বিজ্ঞান হিসেবে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে উপাত্ত সংগ্রহের জন্য মনোবিজ্ঞানে কতকগুলো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

পরীক্ষণ পদ্ধতি : মনোবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক মর্যাদা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে। মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত পদ্ধতিসমূহের মধ্যে পরীক্ষণ পদ্ধতিকে সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি মনে করা হয়। এবং মনোবৈজ্ঞানিক অন্যান্য পদ্ধতির চেয়ে পরীক্ষণ পদ্ধতিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকেন। যে পদ্ধতিতে সুব্যবস্থিত ও সুপরিকল্পিত অবস্থায় সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সাপেক্ষ চলের ওপর স্বাধীন চলের প্রভাব যাচাই করা হয় তাকে পরীক্ষণ পদ্ধতি বলে। অন্যভাবে বলা যায় যে যে কোন অনুসন্ধান কার্য যেখানে উদ্দীপকের প্রভাবের উপর পরীক্ষণের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকে তাকে পরীক্ষণ পদ্ধতি বলে। পরীক্ষণকার্য সাধারণত গবেষণাগারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের ভিতর পরিচালন করা হয়ে থাকে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : পরীক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্ন প্রকার সংজ্ঞা ও মতামত প্রদান করেছেন। সেগুলো নিচে দেয়া হলো।

Barry. F. Anderson বলেছেন, “পরীক্ষণ হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কেউ দুটি চলের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয়ের জন্য একটির মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন এনে দেখেন এর ফলে অন্যটির কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় কিনা।”

Wayne Weiten-এর মতে, “পরীক্ষণ হলো এমন একটি গবেষণা পদ্ধতি যেখানে অনুসন্ধানকারী সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একটি চল প্রয়োগ করেন এবং তার ফলে দ্বিতীয় চলে কোনো পরিবর্তন আসে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করেন।”

বৈশিষ্ট্য : উড্ডয়ার্ন এবং শ্লোজবার্গ (১৯৫৪) পরীক্ষণ পদ্ধতির নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন

১. পরীক্ষক পর্যবেক্ষণীয় ঘটনাটি যখন খুশি তখনই সৃষ্টি করতে পারে না সুতরাং প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি প্রস্তুত থাকেন।

2. তিনি কতকগুলো অবস্থার পরিবর্তন বা হ্রাস বৃদ্ধি করে ফলাফলের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে পারেন।

পরীক্ষণ পদ্ধতির সুবিধা : পরীক্ষণ পদ্ধতি অন্যতম একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। পরীক্ষণ পদ্ধতির কতকগুলো সুবিধা রয়েছে সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। যথাপরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি সুবিধা হচ্ছে পরীক্ষণ পদ্ধতিটি বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ করে চলে। এর ফলে ফলাফল বেশি নির্ভযোগ্য হয়ে থাকে। সুতরাং পরীক্ষণ পদ্ধতি অনেক বেশি বিজ্ঞান নির্ভর।

১. বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ করে :পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিয়ন্ত্রণ। মনোবিজ্ঞানীগণ কোনো বিশেষ আচরণকে গবেষণাগারে সৃষ্টি করেন এবং যেসব অবস্থা বা শর্তের ওপর আচরণটি নির্ভর করে সেসব শর্তকে তিনি পরীক্ষণের প্রয়োজনানুসারে তার ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সুতরাং বলা যায় যে পরীক্ষণ পদ্ধতি অন্যতম একটি পদ্ধতি।

২. চলের নিয়ন্ত্রণ: পরীক্ষণ পদ্ধতিতে চলের নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করা হয় বলে কোনো অবাঞ্ছিত চল পরীক্ষণের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। সুতরাং বলা যায় যে চলের নিয়ন্ত্রণ অন্যতম একটি সুবিধা।

৩. পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি : পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি এর মাধ্যমে কোনো বিষয়ের উপর বার বার পরীক্ষণকার্য পরিচালনা করা যায় সময়, স্থান ভেদে পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব হয়ে থাকে। এর ফলে পরীক্ষণের নকশার কোনো পরিবর্তন হয় না।

৪. অপ্রাসঙ্গিক প্রভাব রোধ : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে অবাস্তব ও অপ্রাসঙ্গিক উপাদান দ্বারা গবেষণা প্রভাবিত হয় না। কেননা এ পদ্ধতিতে পরীক্ষাধীন চলসমূহের ওপর যাতে অন্য চল প্রভাব বিস্তার করতে না পারে সে জন্য চলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর মাধ্যমে পরীক্ষণে যে অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন প্রভাব থাকে সেগুলোকে রোধ করা যায়।

৫. গবেষকের উপস্থিতি : অন্যান্য অনুসন্ধান পদ্ধতি মানে পরীক্ষণ পদ্ধতির একটি পার্থক্য হচ্ছে। অন্যান্য পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহের সময় গবেষককে উপস্থিত না থাকলেও চলে। কারণ তথ্য সংগ্রহণকারী তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু পরীক্ষণ পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ বা পরীক্ষণের সময় গবেষককে উপস্থিত থাকতে হয়।

৬. অনুমান যাচাই : পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে অনুমান যাচাই করা যায়। কেননা পরীক্ষণ পদ্ধতি বিভিন্ন চলকের মধ্যে কেবল পারস্পরিক সম্পর্কই নির্ধারণ করে না বরং এর মধ্য দিয়ে অনুমান যাচাই করে এবং অনুমান গঠন করে।

৭. কম সময় ও অল্প ব্যয় : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে সাধারণত ছোট ও সীমিত আকারে গবেষণাকার্য পরিচালিত হয়। কাজেই এ পদ্ধতিতে অপেক্ষাকৃত কম সময় ও অল্প ব্যয়ে গবেষণা করা সম্ভব হয় ।

৮. সাধারণীকরণ: পরীক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমেফলাফলের সাধারণীকরণ করা যায়। অল্প সংখ্যক দৃষ্টান্ত থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়া যায়।

৯. পরীক্ষণের ফলাফল সঠিক ও সংক্ষিপ্ত পরীক্ষণ পদ্ধতির পরীক্ষণের ফলাফল সঠিক ও সংক্ষিপ্তভাবে প্রকাশ করা যায়। এই পদ্ধতিতে ফলাফল ব্যক্তি দোষে দুষ্ট হতে পারে না। সে জন্য ফলাফল অধিক নির্ভরযোগ্য হয়।

১০. চলের পরিবর্তন: পরীক্ষণ পদ্ধতিতে চলের পরিবর্তন করা যায়। পরীক্ষক তার প্রয়োজন অনুসারে চলের পরিবর্তন করে থাকেন । চলের পরিবর্তন অন্যতম একটি সুবিধা।

পরীক্ষণ পদ্ধতির অসুবিধা : পরীক্ষণ পদ্ধতি অন্যতম একটি পদ্ধতি হয়ে এর কিছু সুবিধা থাকলেও পরীক্ষণ পদ্ধতির কিছু অসুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিচে দেয়া হলো। যথা:

১. পরীক্ষণ পাত্রের সাহায্যহীনতা : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি অসুবিধা হচ্ছে যে, পরীক্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষণপাত্র অনেক সময় পরীক্ষককে গবেষণাক্ষেত্রে সাহায্য সহযোগিতা নাও করতে পারে।

২. বাহ্যিক গবেষণার ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে সকল ঘটনা পরীক্ষণকেন্দ্রে করা হয়। এক্ষেত্রে গবেষণাগারে যেসব ঘটনা সৃষ্টি করা যায় না সেসব ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হয়। যেমন- দাঙ্গাকারী জনতার আচরণ, মিছিলকারীর আচরণ ইত্যাদি।

৩. কৃত্রিম পরিবেশ : পরীক্ষণ পদ্ধতির অন্যতম একটি ত্রুটি হলো কৃত্রিম পরিবেশ। কৃত্রিম পরিবেশে এসে জীবের আচরণ স্বাভাবিকভাবে নাও হতে পারে। অর্থাৎ কৃত্রিম পরিবেশ বুঝে মানুষ কৃত্রিম ধরনের আচরণ করে থাকে ।

৪. নিয়ম কানুনের কঠোরতা : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে পরীক্ষককে কঠোর নিয়মকানুন মেনে চলতে হয় এর ফলে গবেষণার কাজে সমস্যা হয়। কারণ কঠোর নিয়মকানুন মান্য করে অনেকে সঠিক কাজ করতে চায় না।

৫. যন্ত্রপাতির দুষ্প্রাপ্যতা : উপযুক্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় গবেষককে গবেষণার কাজে অচল হয়ে বসে থাকতে চায় আবার সে ক্ষেত্রে গবেষককে যন্ত্রপাতি ও নকশা বানাতে হয় বা ক্রয় করতে হয় যা অধিক ব্যয়বহুল হয়ে থাকে।

৬. গবেষকের প্রভাব : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে যেহেতু গবেষক সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। কাজেই গবেষক ও পরীক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গবেষক অংশগ্রহণকারীদেরকে প্রভাবিত করতে পারেন। যাকে গবেষকের প্রভাব বলে।

৭. সময় সাপেক্ষ : পরীক্ষণের জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে অধ্যয়নের জন্য নির্ধারিত গ্রুপের কোনো সদস্য পরীক্ষণ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করতে পারে বা অন্য কারণে বাদ পড়তে পারে। এ পর্যায়ে ফলাফলে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়ে থাকে।

৮. দক্ষ ও অভিজ্ঞ গবেষকের অভাব: পরীক্ষণ গবেষণার জন্য দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষকের প্রয়োজন। অন্যথায় পরীক্ষণ গবেষণা ভ্রান্ত ও হাস্যকর ফলাফল প্রদান করতে পারে। বাস্তবিক দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষক সব সমাজেই সীমিত।

৯. পরিবর্তনজনিত সমস্যা : পরীক্ষণ পদ্ধতিতে পূর্ব যাচাই এবং পরবর্তী যাচাই করা হয়। কিন্তু উভয় ধরনের যাচাই কালীন সময়ে প্রশ্নপত্র, নির্দেশনা ইত্যাদিতে পরিবর্তন ঘটলে নির্ভরশীল চলকের ওপর অনির্ভরশীল চলকের প্রভাব সঠিকভাবে পরিমাপ করতে পারে না।

১০. নমুনার ছোট আকৃতি : বড় আকারের নমুনা অধ্যয়নে পরীক্ষণ পদ্ধতি কার্যকর নয়। কারণ এ পদ্ধতিতে ব্যাপক আকারের নমুনা নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলো অধ্যয়ন করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, পরীক্ষণ পদ্ধতি অন্যান্য সকল পদ্ধতির কিছু পরিমাণে অসুবিধা থাকলেও এটির ব্যবহার বহুল প্রসারিত। এই পদ্ধতিতে পরীক্ষণের পুনরাবৃত্তি করে ভাল ফলাফল পাওয়া যায় এবং চলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন করা যায়। বাইরের পরিবেশে সাধারণত যে সকল গবেষণা করা যায় সেগুলোকে কৃত্রিম পরিবেশে তৈরি করে গবেষণা করা যায় না। এই পদ্ধতিতে নিয়ম কানুনের কঠোরতা থাকে অনেক বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *