পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও ও শিল্প মনোবিজ্ঞানের কার্যাবলি উল্লেখ কর

পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও। বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানের মধ্যে বৈসাদৃশ্য আলোচনা কর।

অথবা, পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান কি? বিজ্ঞানের জ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা কর।

অথবা, পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান কাকে বলে? সাধারণ জ্ঞান ও বিজ্ঞানের জ্ঞানের মধ্যকার অমিলগুলো আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানের যতগুলি শাখা আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান। ১৮৭৯ সালে জার্মান মনোবিজ্ঞানী উইলহেল্ম উন্ড লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা শুরু হয় একশ বছরের ব্যবধানে এর পরিধি আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দিনকে দিন পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করছে। নিম্নে উল্লেখিত বিষয় আলোচনা করা হলো: 

পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা: মনোবিজ্ঞানের যে শাখা পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে তাকে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে নিম্নে মনোবিজ্ঞানীদের মতামত দেওয়া হলোঃ

রডিজার ও অন্যান্যরা (১৯৮৩) বলেন- পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের শ্রেষত্ব হল যে এটি মৌলিক মনোবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া যেমন সংবেদন ও প্রত্যক্ষণ, প্রেষণা ও আবেগ, শিক্ষণ, স্মৃতি এবং বিজ্ঞান বিবেচনা করে।

রডিজার এবং অন্যান্যরা (১৯৮৪) বলেন- পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান যে সব ক্ষেত্রকে আওতাভুক্ত করে যেখানে পেশাদার আচরণ ও মানসিক জীবন অনুধ্যানের পরীক্ষণের উপর একচেটিয়া নির্ভর করে। 

বিজ্ঞানের জ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নিম্নে বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য দেওয়া হলো :

১. বিজ্ঞান হল কোনো দৃশ্যমান বস্তু বা ঘটনার সুসামঞ্জস্য ও সুনিয়ন্ত্রিত জ্ঞান। আর সাধারণ জ্ঞান হচ্ছে সাধারণ মানুষের চিন্তা ও ধারণা।

২. বিজ্ঞানে দুইটি প্রক্রিয়া রয়েছে। পক্ষান্তরে সাধারণ জ্ঞানে কোনো প্রক্রিয়া নেই।

৩. সাধারণ জ্ঞান লাভের ক্ষেত্রে একটি যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যাই যথেষ্ট অন্যদিকে বিজ্ঞানী জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হন না।

৪. সাধারণ জ্ঞানের সাহায্যে অস্বাভাবিক ঘটনার ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়। অপর পক্ষে বিজ্ঞান স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক উভয় ঘটনার ব্যাখ্যায় তৎপর।

৫. বিজ্ঞানী সমস্যা সমাধানের পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ অন্যদিকে, সাধারণ ব্যক্তি এরূপ কোনো প্রশিক্ষণ জ্ঞান থাকে না।

৬. বিজ্ঞান বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে অগ্রসর হন। অপরদিকে, সাধারণ ব্যক্তির মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষণ থাকে না ।

৭. বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অনেক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার পর তথ্য প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সাধারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ না করেই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

৮. বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পদ্ধতির বেশ গুরুত্ব প্রদান করা হয়। অন্যদিকে, সাধারণ জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো পদ্ধতিগত আলোচনা হয় না।

৯. বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোনো বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যার মধ্যে সামঞ্জস্যতা থাকে। কিন্তু সাধারণ জ্ঞানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যতা থাকায় সম্ভাবনা খুবই কম।

১০. বিজ্ঞানের জ্ঞান পুনঃপুন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, সাধারণ জ্ঞান পুনঃপুন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয় ।

১১. বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বাহ্যিক চরের প্রতি খেয়াল করা হয়। অন্যদিকে, সাধারণ জ্ঞানে কোনো চলের প্রতি খেয়াল রাখা হয় না।

উপসংহার : পরিশেষে বরা যায় যে, মানুষের আচরণ বিচিত্র। এ আচরণকে সব পরিবেশে একইভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। বিভিন্ন পরিবেশে মানুষ বিভিন্নধর্মী আচরণ করে বলে মনোবিজ্ঞানীরা পরীক্ষণ পরিচালনার সময় সে সব দিকের প্রতি লক্ষ্য রেখে কার্য সম্পাদন করেন।

 

পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও। পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানে অধীত আচরণের কি কি দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়?

অথবা, পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বলতে কি বুঝ? পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের অধীত আচরণের বিভিন্ন ধরন ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানের যতগুলি শাখা আছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান। ১৮৭৯ সালে জার্মান মনোবিজ্ঞানী উইলহেল্ম উন্ড লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের গবেষণাগার স্থাপন করেন। সেই থেকে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা শুরু। একশ বছরের ব্যবধানে এর পরিধি আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দিনকে দিন পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। নিম্নে প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয় আলোচনা করা হলো: 

পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা : মনোবিজ্ঞানে যে শাখা পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে তাকে পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান বলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে নিম্নে মনোবিজ্ঞানীদের মতামত প্রদত্ত হলোক্রাইভার ও অন্যান্যরা (১৯৮৩) বলেন পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের বিশেষত্ব হল যে এটি মৌলিক মনোবিজ্ঞানের প্রক্রিয়া যেমন সংবেদন ও প্রত্যক্ষণ, প্রেষণা ও আবেগ, শিক্ষণ স্মৃতি এবং পরিজ্ঞান বিবেচনা করে।

রডিজার এবং অন্যান্যরা (১৯৮৪) বলেন- পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান যে সব ক্ষেত্রকে আওতাভুক্ত করে যেখানে পেশাদার আচরণ ও মানসিক জীবন অনুধ্যানের পরীক্ষণের উপর একচেটিয়া নির্ভর করে। 

পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানে অধীত আচরণের বিভিন্ন ধরন : পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞানের গবেষণাগারে সাধারণ যেসব আচরণ পরিলক্ষিত হয় তা নিম্নে বর্ণিত হলো।

১. প্রতিক্রিয়ার সময়কাল : কোনো উদ্দীপকের উপস্থাপনের আরম্ভ সময় থেকে আরম্ভ করে এর প্রতি প্রতিক্রিয়ার যে সময় ব্যয় করা হয় তাকে প্রতিক্রিয়ায় সময়কাল বলে। প্রতিক্রিয়ার সময় নির্ণয়ের সাহায্যে আমরা পরীক্ষণ পাত্রের প্রতিক্রিয়ায় দ্রুততা, শিক্ষণের শক্তি, মনোযোগ ইত্যাদি পরিমাণ করতে পারি। প্রতিক্রিয়ার সময় কম হলে বুঝা যায় যে পরীক্ষণ পাত্র উদ্দীপকের প্রতি দ্রুত প্রতিক্রিয়া করেছে। প্রতিক্রিয়ার সময় পরিমাপ মনোবিজ্ঞানের গবেষণার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষণ প্রতিক্রিয়ার সময় নির্ণয় করে থাকেন ।

২. প্রতিক্রিয়ার স্থায়িত্বকাল : কোনো উদ্দীপকের প্রতি প্রতিক্রিয়ার আরম্ভ থেকে এর প্রতি প্রতিক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত যে সময় অতিবাহিত হয় তাকে প্রতিক্রিয়ার স্থায়িত্বকাল বলে। সাধারণত কোনো একটি সমস্যা সমাধানের জন্য পরীক্ষণ পাত্র যে সময় ব্যয় করে তাই প্রতিক্রিয়ার স্থায়িত্বকাল।

৩. প্রতিক্রিয়ার পরিমাণ: মনোবিজ্ঞানের অনেক পরীক্ষণে প্রতিক্রিয়ার স্থায়িত্বকালকে পরিমাপ না করে প্রতিক্রিয়ার পরিমাণকে নির্ণয় করা হয়ে থাকে। প্রতিক্রিয়ার পরিমাণ নির্ণয় মনোবিজ্ঞান পরীক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা জানি আইভান পি, প্যাভলব তাঁর পরীক্ষণে কুকুরের মুখ থেকে লালার পরিমাণকে প্রতিক্রিয়া হিসেবে পর্যবেক্ষণ। 

৪. প্রতিক্রিয়ায় ভ্রান্তি : পরীক্ষণের সমস্যা যদি এমন হয় যে পরীক্ষণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষণ – পাত্রকে ভুল শুদ্ধ আচরণের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হবে, সে সব পরীক্ষণে প্রতিক্রিয়ার ভ্রান্তি পর্যবেক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যেমন- সদৃশ্য অংগে শিক্ষণের স্থানান্তর নির্ণয় পরীক্ষণ – পাত্র আয়নায় প্রতিফলণ দেখে তারকাটির দুপার্শের রেখার মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে লাইন টেনে থাকে। এ লাইন টানার সময় ভুল করার সম্ভব না থাকে বলে এ পরীক্ষণে ভুলের পরিমাণকে পর্যবেক্ষণ করা হয়ে থাকে।

৫. প্রতিক্রিয়ার পৌনঃপুন্য: কোনো একটি বিশেষ আচরণ প্রাণী কতবার করতে পারে তার হিসেবে প্রতিক্রিয়ার ইঁদুর কর্তৃক দণ্ডে চাপ দেবার সংখ্যাকে প্রতিক্রিয়া হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় প্রতিক্রিয়ার পৌনঃপুন্য পর্যবেক্ষণ করে হয়ে থাকে।

৬. প্রতিক্রিয়ার গতি : প্রতিক্রিয়ার পৌনঃপুন্যের ন্যায় অনেক পরীক্ষণে প্রতিক্রিয়ার গতিকে নির্ভরশীল চল হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো একটি প্রতিক্রিয়া কতবার সংঘটিত হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করলে প্রতিক্রিয়ার গতি নির্ণয় করা হয়। স্মৃতির পরিমাণ নির্ণয় পরীক্ষণে প্রতিক্রিয়ার গতি পর্যবেক্ষণ কার হয়। যেমন- শিক্ষার্থী যদি শিক্ষণীয় বিষয়বস্তুকে দ্রুত গতিতে পুনরুৎপাদন করতে পারে তা হলে বলা যায় যে তার স্মৃতির পরিমাণ বেশি। অন্যদিকে , শিক্ষার্থী যদি ধীর গতিতে পুনরুৎপাদন করে তা হলে তার স্মৃতির পরিণাম কম হবে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মানুষের আচরণ বিচিত্র এ আচরণকে সব পরিবেশে একইভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। বিভিন্ন পরিবেশে মানুষ বিভিন্নধর্মী আচরণ করে বলে মনোবিজ্ঞানীরা পরীক্ষণ পরিচালনার সময় সে সব দিকের প্রতি লক্ষ্য পর্যবেক্ষণ কার্য সম্পাদন কার্য সম্পাদন করেন।

 

শিল্প মনোবিজ্ঞান কী? শিল্প মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্যসমূহ ব্যাখ্যা কর।

অথবা, শিল্প মনোবিজ্ঞান কাকে বলে? শিল্প মনোবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা হলো শিল্প মনোবিজ্ঞান। শিল্প মনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য হলো শিল্পকারখানা ও কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সমাধান করা। শিল্প উৎপাদনের সাথে কর্মচারীদের মনোবল, দক্ষতা, কর্মসন্তুষ্টি এবং অনুকূল মনোভাব গভীরভাবে সম্পর্কিত। শিল্প মনোবিজ্ঞানী কর্মী বিশ্লেষণ, কর্মচারী নির্যাতন ও কর্মচারী বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করে। শিল্প মনোবিজ্ঞান শিল্পের উৎপাদন নিয়ে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানে শিল্প মনোবিজ্ঞানী কাজ করে থাকে।

শিল্প মনোবিজ্ঞান : শিল্প মনোবিজ্ঞানকে শিল্প কারখানা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত ব্যক্তিদের আচরণের বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। শিল্প মনোবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানের মূলনীতি ও তথ্যসমূহকে শিল্প কারখানা ও ব্যবসাক্ষেত্রে নিয়োজিত। ব্যক্তিদের সমস্যা সমাধান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োগ করে। মনোবিজ্ঞানের যেসব শাখা শিল্প-কারখানা ও ব্যবসায় ক্ষেত্রে সংঘটিত মানব আচরণের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে তাকে শিল্প মনোবিজ্ঞান বলা হয়। শিল্প মনোবিজ্ঞান বিশেষভাবে শিল্প কারখানা ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত ব্যক্তিদের আচরণ আলোচনা করলেও সাধারণভাবে এর পরিসর বিস্তৃত। ব্যাপক অর্থে শিল্প মনোবিজ্ঞানকে মানুষের কার্যকলাপ সংক্রান্ত বিজ্ঞান বলা চলে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা : শিল্প মনোবিজ্ঞানকে বিভিন্ন বিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিম্নে তাদের প্রদত্ত সংজ্ঞা তুলে ধরা হলো :

D.P. Schultz-এর মতে, “শিল্প মনোবিজ্ঞানকে কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের মানবীয় আচরণ অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণের বিষয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।

M.R. ALi (1971)-এর মতে, “শিল্প মনোবিজ্ঞান ব্যবসা ও শিল্পে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আচরণের বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে এ সমস্ত নীতিকে প্রয়োগ করে।”

ডঃ এ, খালেক (১৯৮৫) –এর মতে, “মনোবিজ্ঞানের যে শাখা শিল্প কারখানা ও ব্যবসার ক্ষেত্রে সংঘটিত মানব আচরণের বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করে তাকে শিল্প মনোবিজ্ঞান বলা হয়।”

শিল্প মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্যসমূহ : শিল্প মনোবিজ্ঞান হলো মনোবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা। এই শাখার লক্ষ্য হলো শিল্পকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। নিম্নে শিল্প মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্যসমূহ বর্ণনা করা হলো।

১. দক্ষ কর্মচারী নির্বাচন: শিল্প মনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য হলো দক্ষ কর্মচারী নির্বাচন করা। একজন দক্ষ কর্মী কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করেন। এছাড়া কাজ দক্ষভাবে পরিচালনা করতে দক্ষ কর্মচারীদের ভূমিকা অপরিসীম। শিল্প মনোবিজ্ঞান বিভিন্ন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অভীক্ষার মাধ্যমে কর্মীর যোগ্যতা ও গুণাবলি যাচাই করে সঠিক কর্মী নির্বাচনে ব্যবস্থাপনাকে সহায়তা করে থাকে।

২. উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা : শিল্প কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে শিল্প মনোবিজ্ঞানের গুরুত্ব অপরিসীম। শিল্প কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে তা শিল্প মনোবিজ্ঞানীগণ পরিকল্পনা ব্যবস্থা করে থাকেন। যেকোনো কারখানার অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রাপ্ত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা।

৩. কর্ম উপযোগী পরিবেশ : শিল্প কারখানার পরিবেশ হবে কর্ম উপযোগী। কর্মী সহজে কর্ম সম্পাদন করতে পারে সেদিকে নজর দিতে হবে। কর্ম পরিবেশ যদি কর্ম উপযোগী না হয় তাহলে কর্মচারীরা দক্ষতা অনুযায়ী কর্মক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না ! কর্ম পরিবেশ কর্ম উপযোগী হলে কর্মীরা কারখানায় প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারবে।

৪. মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা সমাধান : শিল্পক্ষেত্রে কর্মীরা নানা ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকে। এসব সমস্যার কারণে তাদের উৎপাদনশীলতা ও মানিসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়ে থাকে। কর্মীদের এসব মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা সমাধান এবং আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করা শিল্প মনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য।

৫. দক্ষতা ও মনোবল বৃদ্ধি : শিল্প মনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য কর্মীদের দক্ষতা ও মনোবল বৃদ্ধি করা। কর্মীদের দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন উপযুক্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষতা ও মনোবল বৃদ্ধি পায় ।

৬. উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা : যেকোনো কারখানার অন্যতম লক্ষ্য প্রাপ্ত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করা। শিল্প মনোবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করে থাকে। সঠিক কর্মী নির্বাচন ও স্থাপন শিল্প সম্পর্কের উন্নয়ন, প্রেষণা ও কর্মসন্তুষ্টি বৃদ্ধি, মনোবল উন্নয়ন ইত্যাদির মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষতা ও মনোবল বৃদ্ধি পায়।

৭. শিল্পে শান্তি প্রতিষ্ঠা : শিল্পে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করাও মনোবিজ্ঞানের লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে শিল্প মনোবিজ্ঞান যৌথ দরকষাকষি, শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, পরামর্শ কার্যক্রম ইত্যাদির মাধ্যমে ভূমিকা পালন করে থাকে। শিল্পে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলে শিল্প কারখানায় উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কারখানার লক্ষ্য অর্জিত হবে।

৮. মানবীয় সম্পর্কের উন্নয়ন : শিল্প মনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য হলো মানবীয় সম্পর্কের উন্নয়ন করা। এই লক্ষ্য অর্জনে শিল্প মনোবিজ্ঞান শিল্প ব্যবস্থাপনার নেতৃত্বের উন্নয়ন, তত্ত্বাবধান, যোগাযোগ, কর্মীদের ব্যবস্থাপনার অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

৯. মানবিক আচরণ অধ্যয়ন : শিল্প মনোবিজ্ঞানের অন্যতম লক্ষ্য হলো মানবীয় আচরণ অধ্যয়ন করা। শিল্প মনোবিজ্ঞান শিল্প কর্মীদের আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ, আচরণের পার্থক্য নিরূপণ, আচরণের উপর প্রভাববিস্তারকারী চলকগুলো পর্যালোচনা এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।

১০. মানবীয় শক্তির অপচয় হ্রাস : ক্লান্তি, মানসিক, অসুস্থাতা দুর্ঘটনা ইত্যাদি কারণে শিল্প ক্ষেত্রে মানবীয় শক্তির যে অপচয় হয় তা হ্রাস করাও শিল্প মনেবিজ্ঞানের লক্ষ্য। এটি ক্লান্তি ও দুর্ঘটনার মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো পর্যালোচনা করে এবং তা রোধে পরামর্শমূলক ব্যবস্থাদির সুপারিশ করে। এ কাজে প্রেষণা ও মনোবলের কৌশলসমূহ ব্যবহার করা হয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, শিল্প মনোবিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য হলো শিল্প কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। শিল্প মনোবিজ্ঞান মানুষের কর্ম ক্ষমতার উপযোগী যন্ত্রপাতি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। কর্মীর উপযোগী যন্ত্রপাতি নির্ধারণ করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন সম্ভব হবে। শ্রমিক ও ব্যবস্থাপকের মধ্যে সম্পর্ক এবং শ্রমিক-শ্রমিক সম্পর্ক উন্নয়নে শিল্প মনোবিজ্ঞান কাজ করে। শিল্প কারখানায় নিয়োজিত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিল্প মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। শিল্প মনোবিজ্ঞান শিল্প-প্রতিষ্ঠানের দুর্ঘটনা রোধে কাজ করে থাকেন। শিল্প উৎপাদনের সাথে কর্মচারীদের মনোবল, দক্ষতা, কর্মসন্তুষ্টি এবং অনুকূল মনোভাব গভীরভাবে সম্পর্কিত।

 

শিল্প মনোবিজ্ঞানের কার্যাবলি উল্লেখ কর।

অথবা, শিল্প মনোবিজ্ঞানের কার্যক্রমগুলো লিখ।

উত্তর : 

ভূমিকা : শিল্প মনোবিজ্ঞান শিল্পক্ষেত্রের সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করে। শিল্পক্ষেত্রে কর্মনির্বাচন, উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মীদের প্রেষণাদান, হতাশা দূরীকরণ, মনোবল বৃদ্ধিতে শিল্প মনোবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শিল্প মনোবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শিল্প মনোবিজ্ঞান কর্মীগণের মধ্যে মানবীয় সম্পর্ক বিশ্লেষণ ও উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শিল্পের কর্মীগণ যাতে অপেক্ষাকৃত কম দৈহিক চলাচলের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পরিমাণ কাজ করতে পারে। শিল্প কারখানায় নিয়োজিত কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিল্প মনোবিজ্ঞান কাজ করে ।

শিল্প মনোবিজ্ঞানের কার্যাবলি : শিল্প মনোবিজ্ঞানের প্রধান কাজ শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করা। নিম্নে শিল্প মনোবিজ্ঞানের কার্যাবলি উল্লেখ করা হলো।

১. ব্যবস্থাপনাকে পরামর্শ প্রদান : শিল্প মনোবিজ্ঞানে প্রথম কাজ হলো শিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনাকে পরামর্শ প্রদান করা। যাতে ব্যবস্থাপনার যাবতীয় মানবীয় বিষয়ে সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পদক্ষেপ নিতে পারে।

২. শিল্পীর পরামর্শ প্রদান : শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মীগণ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয় তা মোকাবেলা করার জন্য তাদের কী করা উচিত মনোবিজ্ঞানী সে বিষয়ে উপযুক্ত প্রামর্শ প্রদান করে থাকে। অবশ্য এই পরামর্শ শিল্পে ও কর্মীদের পারস্পরিক স্বার্থেই হয়ে থাকে।

৩. সময়, গতি ও ক্লান্তি গবেষণা : শিল্পের কর্মীগণ যাতে সময়ের যথাযথ ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। তারা যাতে অপেক্ষাকৃত কম দৈহিক চলাচলের মাধ্যমে কাজ করতে পারে এবং ঘনঘন ক্লান্তির শিকারে পরিণত না হয়ে দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা পরিচালনা করা শিল্প মনোবিজ্ঞানীর কাজ।

৪. নেতৃত্ব সৃষ্টি : শিল্পক্ষেত্রে উপযুক্ত নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। শিল্প মনোবিজ্ঞান এ ব্যাপারে পরিকল্পিত উপায়ে অগ্রসর হতে পারে।

৫. প্রশিক্ষণ : কর্মীদের নির্বাচনের পরে প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের ব্যাপারে শিল্প মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা রয়েছে। প্রশিক্ষণ নীতি প্রণয়ন, কোর্স প্রস্তুতকরণ, প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষার্থী মূল্যায়ন ইত্যাদি কাজে শিল্প মনোবিজ্ঞান সার্থকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে।

৬. মানবীয় প্রকৌশল: শিল্প কারখানার যন্ত্রপাতির সাথে কর্মীদের শক্তি ও সামর্থ্যের সমন্বয় সাধন করে শিল্প মনোবিজ্ঞান। কেননা যন্ত্রপাতির প্রকৌশলগত দক্ষতার সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে এগুলোর সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যায় না।

৭. আচরণ পরিবর্তন : কর্মী আচরণের উপর শিল্পের উৎপাদনশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে আচরণ পরিবর্তনের কোনো বাহ্যিক মানদণ্ড নেই। শিল্প মনোবিজ্ঞানী কর্মীদের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য কাম্য আচরণ তাদের উপযুক্ত পরামর্শ দেন।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের মত শিল্প উন্নয়নশীল দেশে শিল্প মনোবিজ্ঞানের কাজ অনেক। মানবীয় আচরণ যে শিল্পোৎপাদন ও শ্রম ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ভূমিকা রাখে তা গুরুত্বের সথে বিবেচনা করতে হবে। শিল্প মনোবিজ্ঞান কর্মী অসন্তোষ দূরীকরণ, কর্মী মনোবল বৃদ্ধি ও শ্রম ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শিল্প কারখানায় নিয়োজিত কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে শিল্প মনোবিজ্ঞান কাজ করে থাকে।

 

শিল্প মনোবিজ্ঞান অধ্যয়ন করে ছাত্র ও ব্যবস্থাপকদের কী উপকার সাধিত হয়? তা আলোচনা কর।

উত্তর

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানের অন্যতম শাখা হলো শিল্প মনোবিজ্ঞান। শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠ করে ছাত্রছাত্রীরা শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যবস্থা ও পরিচালনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। একজন মনোবিজ্ঞানী যন্ত্রপাতির নকশা প্রণয়নের সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রকৌশলীকে সহায়তা প্রদান করতে পারে। শিল্প মনোবিজ্ঞানীরা কর্মীদের প্রেষণার উৎস উদ্ভাবন করে এবং কর্মীদের বিভিন্ন প্রকারের চাহিদা বিশ্লেষণ করেন। শিল্প মনোবিজ্ঞান কর্মীদের মধ্যে কর্মের প্রতি মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। শিল্প ও ব্যবসা ক্ষেত্রে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সমস্যা সমাধানে শিল্প মনোবিজ্ঞানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন । তাই ছাত্রীদের শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠ করতে হবে।

ছাত্র-ছাত্রী ও ব্যবস্থাপকদের নিকট শিল্প মনোবিজ্ঞান অধ্যয়নের প্রয়োজনীয়তা : শিল্পক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম। কিছুদিন পূর্বে ও শিল্পক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের প্রয়োজন অনুভূত হয়নি। কিন্তু বর্তমান ব্যবসায় বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্র দ্রুত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ব্যবস্থানার ক্ষেত্রে জটিলতাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নে ছাত্র-ছাত্রী ও ব্যবস্থাপকদের নিকট শিল্প মনোবিজ্ঞান অধ্যনের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হলো :

১. উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার প্রকৃতি অনুধাবন করে তাদের বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করা হয়। শিল্পকারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধিতে শিল্প মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান অত্যাবশ্যক। শিল্প কারখানার পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মীদের নির্বাচন ও প্রশিক্ষণে শিল্প মনোবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২. মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধান : শিল্পক্ষেত্রে দিন দিনই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান ছাড়া এসব সমস্যায় সুষ্ঠু সমাধান কষ্টকর হয়ে থাকে। তাই শিল্প মনোবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে অনুভূত হচ্ছে। শিল্পকর্মীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করে। তাই শিল্পক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধানে শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

৩. আচরণ পরিবর্তন : কর্মীগণের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার প্রকৃতি পরিবর্তিত হওয়ার সাথে আচরণগত সমস্যাও জটিল আকা ধারণ করছে। মনোবিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ থাকলে কর্মীদের এসব আচরণের কারণ সম্পর্কে ভালোভাবে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তাই শিল্প মনোবিজ্ঞান ক্রমবর্ধমানহারে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শিল্পকর্মীদের আচরণ নির্ধারণে শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠের গুরুত্ব অনেক।

৪. মানবীয় সম্পর্ক উন্নয়ন শিল্পে মানবীয় সম্পর্ক উন্নয়ন একটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে পর্যবসিত হয়েছে। মানবীয় সম্পর্ক কীভাবে উন্নত করা যায়। কীভাবে ব্যবস্থাপনা কর্মীদের প্রতি এবং কর্মীগণ ব্যবস্থাপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে শিল্প মনোবিজ্ঞান সে সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দিতে পারে।

৫. যথার্থ প্রশিক্ষণ : প্রশিক্ষণ কর্মীদের দক্ষতা, নৈপুণ্য, জ্ঞান বৃদ্ধি ও অনুকূলভাবে মনোভাব পরিবর্তন করে। তবে শর্ত হলো প্রশিক্ষণে কর্মীদের আগ্রহ থাকতে হবে। এজন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণের প্রতি কর্মীদের আগ্রহ ও প্রবণতা যাচাই করা। শিল্প মনোবিজ্ঞান এই ব্যাপারে ব্যবস্থাপনাকে সহায্য করতে পারে। কিভাবে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলে কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে তা শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে জানা যায়।

৬. শ্রম ঘূর্ণায়মানতার কারণ নির্ণয় : শ্রম ঘূর্ণায়মানতা শিল্পের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কিন্তু কী কারণে কর্মীগণ ঘন ঘন কার্য পরিত্যাগ করে চলে যায় তার বাহ্যিক কারণ নির্ণয় ও তার সমাধান যথেষ্ট নাও হতে পারে। এর পেছনে মনস্ত ত্ত্বিক কোনো কারণ থাকলে তা নির্ণয়ে শিল্প মনোবিজ্ঞান অবদান রাখতে পারে।

৭. অনুপস্থিতি হ্রাস : শিল্পের কর্মীগণ অসন্তুষ্ট থাকলে তাদের অনুপস্থিতির হার বেড়ে যেতে পারে। এই অনুপস্থিতির মানসিক কারণ নিরূপণ করতে হলে মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান আবশ্যক। মনোবিজ্ঞান অনুপস্থিতির হার হাসে কার্যকর পন্থা নির্ধারণেও কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। শিল্প মনোবিজ্ঞানীরা শিল্পকারখানায় কর্মী অনুপস্থিতির হার কীভাবে রোধ করা যায় তা শিল্প মনোবিজ্ঞানের অন্যতম কাজ।

৮. পরীক্ষণে সতর্কতা : কর্মী নির্বাচনে পরীক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। শুধু কারিগরি পরীক্ষা এ ব্যাপারে যথেষ্ট নয়। বরং মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার আবশ্যকতা রয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে কর্মীদের আবেগ, কাজের প্রতি ঝোক, দক্ষতা ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেদিক থেকে শিল্প মনোবিজ্ঞান সহযোগিতা তার হাত নিয়ে এগিয়ে আসে।

৯. হতাশা দূরীকরণ : কর্মীদের হতাশা দূরীকরণে শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠ একান্ত প্রয়োজোন। হতাশা উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে। কর্মীদের কাজের প্রতি অনাগ্রহী ও শিল্পে লোকসানের হার বৃদ্ধি করে। কাজেই এর নিরসন হওয়া জরুরি। এ শিল্প মনোবিজ্ঞান এই হতাশার কারণ নির্ণয় ও তা দূরীকরণের কার্যকর পন্থা উদ্ভাবনে এগিয়ে আসে।

১০. কল্যাণ সুবিধা বৃদ্ধি : শিল্পে কল্যাণমূলক সুবিধা বৃদ্ধি করলে কর্মীগণের সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া কর্মীদের অনুপস্থিতির হার কম হয়, কারখানায় দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর্থিক সুবিধা ছাড়া কি অ-আর্থিক এবং মনস্তত্ত্বিক সুবিধা কর্মীদের সন্তুষ্টি আনয়ন করতে পারে মনোবিজ্ঞান গবেষণায় তার সর্বোৎকৃষ্ট জবাব মিলতে পারে। শিল্প মনোবিজ্ঞান কর্মীদের কল্যাণমূলক সুবিধা নিয়ে আলোচনা করে থাকে।

১১. যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি : যোগ্য ও দূরদর্শী নেতা শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দৈহিক গুণাবলীর সাথে সাথে মনস্তাত্ত্বিক গুণাবলি যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারে। দৈহিক গুণাবলীর সাথে সাথে মনস্তাত্ত্বিক গুণাবলি যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারে। দৈহিক গুণাবলীর সাথে সাথে মনস্তাত্ত্বিক গুণাবলি যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে পারে। যোগ্য নেতৃত্ব অনুসারীদের আকৃষ্ট করতে পারে। শিল্প মনোবিজ্ঞান একজন যোগ্য নেতা গড়ে তুলতে পারে। যোগ্য নেতা একটি শিল্প কারখানাকে সটিকভাবে পরিচালনা করতে পারে।

১২. দল গঠন : দল গঠন ও দলীয় গতিশীলতা সৃষ্টি শিল্পে উপযুক্ত কার্য পরিবেশ গড়ে তালো সম মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত দল শিল্পে অসাধ্য উদ্দেশ্য সাধন ত্বরান্বিত করে। শিল্প মনোবিজ্ঞান এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীগণ ও প্রশাসনিক পথ নির্দেশ দিতে পারে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে শিল্প মনোবিজ্ঞান শিল্প ও কর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও সমাধান করে থাকে। শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠ করে ছাত্রছাত্রী শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক, কর্মসন্তুষ্টি, শিল্প উৎপাদন কৌশল ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারে। শিল্প কারখানার শিল্প মনোবিজ্ঞানী কর্মচারী নির্বাচন, প্রশিক্ষণ, তত্ত্বাবধান, মূল্যায়ন, শিল্পের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, মানব সম্পর্ক সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদান করে থাকে। শিল্প মনোবিজ্ঞানীগণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিল্প ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের উপর গবেষণা করে থাকে। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের শিল্প মনোবিজ্ঞান পাঠ করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *