বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারা আলোচনা কর

অথবা, সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও।

অথবা, সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মানুষের জীবন প্রণালি হচ্ছে সংস্কৃতি। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। সমাজে তার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তাদের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে তাদের কলাকৌশল ও চিন্তা ভাবনা দ্বারা যা আবিষ্কার করে তার দ্বারা তাদের মূল্যবোধ, আদর্শ, নীতিবোধ, শিল্পকলা ইত্যাদি প্রকাশ পায়। তাই সংস্কৃতি হলো সমাজবদ্ধ মানুষের বৈচিত্রপূর্ণ পরিচয়ের অর্থবহ উপাদান। সভ্যতার উৎকর্ষ ও বিকাশসাধনে সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিকে সুন্দরভাবে বসবাস করার ক্ষেত্রে সংস্কৃতির ভূমিকা বিদ্যমান। সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষ তার সমাজ জীবনকে সার্থক, সুন্দর ও গতিশীল করে গড়ে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারা : বাংলাদেশের সংস্কৃতি মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতিরূপ। যদিও গ্রামীণ সংস্কৃতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে তারপরও এই সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ধারা পরিলক্ষিত হয়। সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে সংস্কৃতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. শিক্ষার বিস্তার : ব্যাপক শিক্ষা প্রসারে ফলে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। শহর গ্রাম নির্বিশেষে সারা দেশে ব্যাপক হারে শিক্ষা বিস্তারের ফলে দেশের শিক্ষিতের হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সব জায়গায় প্রাথমিক বিদ্যালয় বিদ্যমান। প্রায় প্রতিটি গ্রামে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বাড়ির আশে পাশে বিদ্যালয় হওয়াতে মানুষ যেমন- সচেতন হচ্ছে তেমনি তাদের চিন্তা চেতনা, আচার আচরণ ইত্যাদিতে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

২. শিল্পের প্রসার : বাংলাদেশের শিল্পের প্রসারের ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। শিল্পের প্রসারের কারণে গ্রামের মানুষ কাজের জন্য শহুরে গিয়ে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় যোগ দেয়, শহরে জনবসতি গড়ে তোলে। যার ফলে সেখানে নতুন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এত বিপুল সংখ্যক মানুষ একত্রে বসবাস করার ফলে একটি নতুন পরিবেশ নতুন সংস্কৃতির আবির্ভাব হয়। কেননা সেখানে বিভিন্ন স্থানের মানুষ গিয়ে জড়ো হয়। সেখানে নতুন পরিবেশের সাথে খাপ-খাইয়ে চলতে হয়। ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

৩. নগরায়ন : বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে নগরায়ন হচ্ছে। যার কারণ গ্রামের মানুষ যেমন- শহরে যাচ্ছে তেমনি শহরের মানুষের সাথে গ্রামের মানুষের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামের অর্থনীতি যেমন- শহরের অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল তেমনি সাংস্কৃতিক নির্ভরশীলতার জন্ম দিয়েছে। যার কারণে গ্রামের সংহতি শহরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এতে করে গ্রামীণ সংস্কৃতি প্রভাবিত হচ্ছে। এভাবে বিশ্ব সংস্কৃতি দ্বারাও বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রভাবিত হয়। যার ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

৪. গণমাধ্যমের প্রসার : বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনশীলতার অন্যতম কারণ হলো গণমাধ্যমের প্রসার। গণমাধ্যমের উন্নয়নের ফলে গ্রাম এবং শহরের রেডিও, টেলিভিশনগুলোর সম্প্রচারিত তথ্যগুলোর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। শহরে যা প্রচার করা হয় একই সাথে গ্রামেও তাই প্রচার করা হয়। গ্রামীণ সমাজের অনেক অশিক্ষিত মানুষ এসব প্রচার মাধ্যমের দ্বারা অনেক কিছু জানতে পারে। যার ফলে গ্রামীণ জীবনের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

৫. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন: বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাপক হারে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। যার কারণে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহজে যোগাযোগ করা যায়। দেশের এক প্রান্তের সামাজিক অবস্থা অন্য প্রান্তে সহজে জানা যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দেশে বিচ্ছিন্ন গ্রাম বা জনপদগুলো শহরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। যার ফলে গ্রামীণ সমাজের জীবন ব্যবস্থা শহরের সমাজের জীবন ব্যবস্থা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এভাবে গ্রামীণ সমাজে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

৬. পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রবেশ : ভিন্ন ভিন্ন সমাজ বা দেশে ভিন্ন ভিন্ন সংহতি বিদ্যমান। প্রত্যেক দেশে বা সমাজের সংস্কৃতি তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে চলে। তেমনি আমাদের দেশের সংস্কৃতির আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রবেশের ফলে এদেশের সংস্কৃতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে। যার কারণে এদেশের অনেক মানুষ পশ্চিমা সংস্কৃতিতে আস্থাভাজন হয়ে তাদের সংস্কৃতি গ্রহণ করছে। এভাবে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় ।

৭. প্রযুক্তির উন্নয়ন : বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বিভিন্ন ইন্টারনেট মাধ্যমের দ্বারা অতি সহজে যোগাযোগ করা যায়। অর্থাৎ পুরো বিশ্ব হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একস্থানের সংস্কৃতির সাথে অন্য স্থানের সংস্কৃতির সহজে পরিচয় হওয়া যায়। যার ফলে তুলনামূলক উন্নত সংস্কৃতির দিকে মানুষ ঝুকে পড়ে। ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

৮. অর্থনৈতিক উন্নয়ন : বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপক ভূমিকা বিদ্যমান। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নয়ন ঘটেছে। ফলে গ্রামীণ ও শহুরে সমাজের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যার ফলে সামাজিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

৯. কৃষির উন্নয়ন : বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি। তারা দেশের কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষি কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি আসার কারণে গতানুগতিক ধারা বাদ দিয়ে উন্নত যন্ত্রপাতি দ্বারা চাষ করার কারণে বেশি ফসল উৎপাদন হচ্ছে। ফলে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। যার প্রভাব মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনে পড়ছে। ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটেছে।

১০. প্রতিবেশগত পরিবর্তন প্রতিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। প্রতিবেশগত পরিবর্তনের ফলে গোটা সংস্কৃতি ব্যবস্থায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন- পূর্বে দেখা যেত মাঝি পালের নৌকা দিয়ে মাছ ধরত। কিন্তু বর্তমানে প্রতিবেশ পরিবর্তনের ফলে অনেক নদী শুকিয়ে গেছে। আর সেভাবে পাল তোলা নৌকা চলে না। যেগুলোর পরিবর্তে ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলে। এসব প্রতিবেশগত পরিবর্তন মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করে।

১১. এন.জি.ও কার্যক্রম : বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে এন.জি.ও কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়। গ্রাম শহরে এদের কার্যক্রমের ফলে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। এর সাথে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের চিন্তা চেতনার ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এই সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি গ্রামের মানুষের সচেতনতা তৈরিতে সাহায্য করে। যার প্রভাব দেশের সংস্কৃতির উপর পড়ে।

১২. আধুনিকায়ন : আধুনিকায়নের প্রভাব সারা বিশ্বে পরিলক্ষিত হয়। এমনকি বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আধুনিকায়নের ফলে মানুষের জ্ঞান বিজ্ঞান, সচেতনতা ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একে অন্যের কাছাকাছি এসেছে। মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপট মূলত এক দিনের নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে। তাছাড়া সংস্কৃতি মানুষের অর্জিত বিষয়। আর সমাজ পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। যার প্রভাব সমাজবদ্ধ মানুষের উপরে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আর যার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও আওতামুক্ত নয় ।l

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *