বিকাশমূলক পরিবর্তন কি? বিকাশমূলক পরিবর্তনের লক্ষ্য শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা কর।

অথবা, বিকাশমূলক পরিবর্তনের অর্থ কি? বিকাশমূলক পরিবর্তনের হার এবং প্রকারভেদ আলোচনা কর।

উত্তর :

ভূমিকা : বিকাশ মনোবিজ্ঞান আধুনিক মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। যে শাখায় একজন মানুষের ভ্রুণ থেকে শুরু করে বয়ঃবৃদ্ধ পর্যন্ত সামগ্রিক রূপ রেখা প্রদান করে। ব্যক্তির মধ্যে সমস্ত চিন্তা চেতনাকে বিকশিত করে। দিনের পর দিন বিকাশ মনোবিজ্ঞানের পরিধি, বিষয়বস্তু এবং গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিকাশ মনোবিজ্ঞানের এই জীবনকালের যে সামগ্রিক পরিবর্তন প্রক্রিয়া সৃষ্টি হয় তা বিকাশমূলক পরিবর্তন।

বিকাশমূলক পরিবর্তন : সাধারণভাবে বিকাশ মনোবিজ্ঞানে মানব জীবনব্যাপী ক্রম উন্নয়নশীল সামগ্রিক পরিবর্তন প্রক্রিয়াকে বলা হয় বিকাশমূলক পরিবর্তন।

বিকাশের এই ধরনের পরিবর্তনের অর্থ বলতে কোনো ব্যক্তির উচ্চতা বা যোগ্যতার বৃদ্ধিকে বোঝায় না। এটি দ্বারা দেহের অসংখ্য সংগঠন এবং অঙ্গপতঙ্গের কার্যাবলির একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া বোঝায়। এটি মুলত বিকাশের গুণগত পরিবর্তন। মানব প্রাণের সূচনা থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত এরূপ প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হয়। ভ্রুণ পর্যায়ে যদিও কোষের ক্ষয় চলতে থাকে তবুও অল্প বয়সে পরিবর্তন প্রক্রিয়া প্রাধান্য লাভ করে। একইভাবে পরিণত বয়সে কোষের পুষ্টিজনিত ক্ষয় প্রাধান্য লাভ করলেও কোনো অঙ্গের পরিবর্তন একই সঙ্গে সংঘটিত হয়। যেমনচুল বৃদ্ধি পায় ও কোষ স্থানান্তর প্রক্রিয়া ক্রমাগত চলতে থাকে। বয়স পরিবর্তনের সাথে সাথে অন্যান্য অঙ্গ ও ক্ষমতার চেয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মানসিক ক্ষমতা বেশি পরিবর্তন হয়। শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার সম্মিলনে শিশুর মধ্যে নানা ধরনের জটিল কর্মক্ষমতার সঞ্চার হয়। পুনারাবির্ভাবকে যদিও পরিবর্তনের একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া বলা হয়। সুতরাং বিকাশ একটি মানসিক ক্ষমতার বিকাশের ধারার প্রাথমিক জীবনে যোগ্যতার উন্নতি, পরবর্তী সময়ে এর অবনতি ও বৃদ্ধিজনিত একটি নিরবচ্ছিন্ন ও যৌগিক প্রক্রিয়া যা শাশ্বত ও চিরন্তন। পরিবেশে বাস করে বিকাশজনিত পরিবর্তনের মাধ্যমে সে নিজেকে সেই পরিবেশের উপযোগী করে তোলে। এই ক্ষমতা বিকাশ পরিবর্তনের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বিকাশ পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য রয়েছে। মানুষ যে তোলার অভিপ্রায়কে দৃঢ়সংকল্প বলা হয়। এর অর্থ হলো ব্যক্তি যে কাজের উপযোগী আগ্রহ সহকারে সেই কাজ সম্পন্ন অর্জনের জন্য প্রয়োজন হয় আত্মোপলব্ধি। তবে এর লক্ষ্যটি কখনো স্থায়ী নয়। পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে সঙ্গতিপূর্ণ করে করা। অর্থাৎ স্বীয় চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালায়। এজন্য এ ক্ষমতা অর্জিত হয় জন্মগত ক্ষমতা ও প্রশিক্ষণের মাত্রা মোতাবেক। এটি জন্মগত ক্ষমতা তথা বিকাশের উপর নির্ভর করে। তাই এটি হচ্ছে বিকাশের অন্যতম লক্ষ্য।

বিকাশের পরিবর্তনের হার : বিকাশ মনোবিজ্ঞানের বিকাশের পরিবর্তনের হার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সবসময় একই হারে ঘটে না। গর্ভধারণ মুহূর্ত থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনের ফলে সৃষ্ট জাইগোটটির আকৃতি আলপিনের মাথার মত হয় এবং দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দুই মাসে মানুষে পরিণত হয়। এভাবে আস্তে আস্তে বাচ্চা শিশুতে পরিণত হয় এবং শেষে বাচ্চা শিশু পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়।

জন্মের পর শিশু আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে এবং তার শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের বর্ধন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। আবার দেখা গেছে বর্ধন হারের সাথে সামাজিক ও আবেগজনিত সমস্যা সম্পর্কযুক্ত। জন্মের তিন বছর পর থেকে বিকাশের হার তুলনামূলকভাবে কিছুটা মন্থর থাকে। আবার ছয় বছর পর বিকাশের হার আরও কিছুট মন্থর হয়। তবে বয়ঃসন্ধিকাল থেকে বিকাশের হার আবার দ্রুত হয় এবং প্রাপ্ত বয়সের দুই এক বছর পূর্বে তা পুনরায় মন্থর হয় অর্থাৎ ত্রিশ বছরের পর বিকাশের গতি মন্থর হতে থাকে।

বিকাশমূলক পরিবর্তনের প্রকারভেদ বা শ্রেণিবিভাগ : বিকাশ একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। বিকাশমূলক পরিবর্তনের লক্ষ্য ও হারের মত এর রয়েছে শ্রেণি বিভাগও। বিকাশমূলক পরিবর্তন ধারাকে (৪) চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা:

১. আকৃতিগত পরিবর্তন : ভ্রুণ থেকে আকারের বৃদ্ধি ঘটে এবং পরিণত মানুষে রূপান্তরিত হয়। মানুষের বৃদ্ধির সাথে সাথে সময়ের পরিবর্তনে ওজন, উচ্চতা বৃদ্ধি এবং দেহের আকার পরিবর্তন হয়। শারীরিক গ্রন্থিসমূহ বৃদ্ধির সাথে সংগতি রেখে আকারে বৃদ্ধি পায়। গ্রন্থিসমূহের মধ্যে হৃদপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র ইত্যাদির পরিবর্তন হয়। এসব পরিবর্তনকে বলা হয় আকৃতিগত পরিবর্তন।

২. অনুপাতের পরিবর্তন: শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে মূলত বয়ঃবৃদ্ধির ফলে। মানুষের শারীরিক বৃদ্ধিজনিত যে পরিবর্তন দেখা যায় তা আনুপাতিক হারে পরিবর্তন হয়। যেমন শিশুর দেহে ঘাড়ের চেয়ে মাথা ও কপাল বড় হয় আবার মাথার আকৃতির সাথে সংগতি রেখে পা ও শরীর বৃদ্ধি পায়। শারীরিক বর্ধনের মতো মানসিক বিকাশ ও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পায়। যেমন শিশুর অবস্থায় ব্যক্তিত্বে শুধু প্রভাব বেশি থাকে। বয়ঃবৃদ্ধির সাথে Ego এবং প্রাপ্ত বয়সে Super ego হয়।

৩. পুরাতন বৈশিষ্ট্যের অবলুপ্তি : বিকাশমূলক পরিবর্তনের অন্যতম হচ্ছে পুরাতন বৈশিষ্ট্যের অবলুপ্তি। বিকাশের ক্ষেত্রে পুরাতন বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষের মানবীয় অনেক বৈশিষ্ট্য লোপ পাওয়ার মাধ্যমে এই ধরনের অবলুপ্তি ঘটে। যেন- শিশুর দাঁত পড়ে যাওয়া এবং আবার দাঁত উঠা, বয়ঃসন্ধিতে গলার স্বর পরিবর্তন হওয়া প্রভৃতি। শিশুর বসতে শেখা, দাঁড়াতে শেখা, হাঁটতে শেখা, কথা বলতে শেখা এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের আওতাধীন এবং এসব মানসিক বিকাশ পরিবর্তনের আওতাধীন।

৪. নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন: বিকাশ পরিবর্তনের নতুন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পুরাতন বৈশিষ্ট্যের সাথে নতুনকে গ্রহণ করা উদাহরণস্বরূপ শিশুর দুধ দাঁত পড়ে নতুন দাঁত উঠা, পড়তে পড়তে হাঁটতে শেখা, বয়ঃসন্ধিতে ছেলে মেয়েদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন ঘটে, শিশু ছেলে মেয়েদের মধ্যে শারীরিক পরিবর্তন, প্রজনন অঙ্গে পরিবর্তন প্রভৃতি। এছাড়া শিশু ছেলে মেয়েদের চিন্তাভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। লক্ষ্য, হার এবং এর শ্রেণিবিভাগ মানবীয় দিক দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

উপসংহার: বিকাশমূলক পরিবর্তন একটি উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান পরিবর্তনের অর্থ চিরাচরিত ঘটনা। বিকাশমূলক পরিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রগতিশীল ঘটনা। এটি মনুষ্য জীবনে পূর্ববর্তী এবং বর্তমান ঘটনার পরিবর্তনের মধ্যে সমন্বয় করে। তাই পরিশেষে আমরা একথা বলতে পারি, বিকাশমূলক পরিবর্তনের অর্থ বহুমুখী ও প্রগতিশীল প্রক্রিয়া। ফলে বিকাশমূলক পরিবর্তনের উপর সকলে পূর্ণ আস্তা ও জ্ঞান রাখা আবশ্যক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *