বিজ্ঞান ও জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্থান নির্দেশ কর

অথবা, বিজ্ঞান ও জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দেখাও।

উত্তর : 

ভূমিকা : আধুনিক মনোবিজ্ঞান হলো মানুষ ও প্রাণীর আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া সম্পর্কিত বিজ্ঞান । মনোবিজ্ঞান বর্তমানে একটি বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞান হিসেবে পরিগণিত। মনাবিজ্ঞান কোনো ধরনের বিজ্ঞান তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক থাকলেও আধুনিক মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান নির্ভর জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি জৈবিক ঘটনাবলি ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত প্রাণী আচরণের বিশ্লেষণ করে। মনোবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কিছু আলোচ্য বিষয়বস্তু রয়েছে। বিজ্ঞান ও জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্থান অনেক উচ্চস্তরে। এজন্য মনোবিজ্ঞানকে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান বলা হয়।

বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্থান : বিজ্ঞান শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বিশেষ জ্ঞান। যে কোনো বিশেষ শ্রেণির বস্তু বা ঘটনা সম্পর্কে যথাযথ ও সুসংবদ্ধ জ্ঞানকে বিজ্ঞান বলা হয়, বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে পরীক্ষণযোগ্য ও পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে হবে। বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন বস্তু বা ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে সাধারণ নিয়ম আবিষ্কার করা। অন্যান্য বিজ্ঞানের মতো মনোবিজ্ঞানেরও আলোচ্য বিষয়বস্তু রয়েছে। তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার ও দৃষ্টিভঙ্গি উল্লেখ করে তার সাথে মনোবিজ্ঞানকে তুলনা করে দেখা যায় যে মনোবিজ্ঞান বিজ্ঞান কি-না।

কোনো বিষয়বস্তু বিজ্ঞান কি-না তা নির্ভর করে চারটি ঘটনা বা বিষয়ের উপর। নিচে তা আলোচনা করা হলো। যথা:

১, বিষয়বস্তু : বিজ্ঞান যে বস্তু বা ঘটনার অনুধ্যান করে তা নিয়ম সাপেক্ষ। তাছাড়া বিজ্ঞানের বিষয়বস্তুর কতকগুলো বৈশিষ্ট্য রয়েছে । যথা

(ক) বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু পর্যবেক্ষণযোগ্য হবে।

(খ) বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ভাষার সাহায্যে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে।

(গ) বিষয়বস্তুকে প্রমাণ সাপেক্ষ হতে হবে। মনোবিজ্ঞানের মূল বিষয়বস্তু হলো মানুষ ও প্রাণীদের আচরণ বিশ্লেষণ।

মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বিজ্ঞানের উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো খুব ভালভাবে পূর্ণ করে। তাই বিষয়বস্তুর দিক থেকে মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান বলা যায়।

২. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি : বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো গবেষণা পদ্ধতি বিষয়বস্তু নয়। বিজ্ঞানের নিজস্ব কিছু পদ্ধতি রয়েছে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় যে সকল পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। যথা:

(ক) কার্যকরী সংজ্ঞা : বিজ্ঞানী বা গবেষক যে বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন তার প্রতিটা পদের সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদানই হলো কার্যকরী সংজ্ঞা। গবেষক তার গবেষণার বিষয় সম্পর্কে একটি কার্যকরী সংজ্ঞা প্রদান করেন। কারণ কার্যকরী সংজ্ঞা প্রদান ছাড়া বিষয়টির দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা পরিচালনার সময় বিষয়বস্তুকে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে থাকে।

(খ) ব্যক্তি নিরপেক্ষতা : বস্তুনিষ্ঠতা বা ব্যক্তি নিরপেক্ষতা বলতে বুঝায় কোনো বিষয় সবার কাছে একইভাবে অর্থপূর্ণ হওয়া। ব্যক্তিনিষ্ঠ কোনো বিষয় বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হতে পারে না। তাই মনকে বাদ দিয়ে আচরণকে মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ একটি বিশেষ আচরণ স্থান কাল পাত্রভেদে সবার কাছে একই অর্থপূর্ণ মনে হয়।

(গ) নিয়ন্ত্রণ : পরীক্ষণ পরিবেশের নিয়ন্ত্রতন করতে না পারলে তাকে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি বলা যায় না। পরীক্ষণের নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝায় অনির্ভরশীল চলের সাথে নির্ভরশীল চলের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে অনুধাবনের জন্য অবাঞ্ছিত চলকে ধ্রুব রেখে পরীক্ষণ পরিচালনা করা। মনোবিজ্ঞানীগণ পরীক্ষণ পদ্ধতির সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জীবের আচরণ গবেষণা করে থাকেন।

(ঘ) পুনরাবৃত্তি : পুনরাবৃত্তি বিজ্ঞানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কোনো একটি বিষয় নিয়ে বার বার গবেষণা করাকে পুনরাবৃত্তি বলে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায়ও কোনো গবেষণার ফলাফলকে যাচাই করার জন্য ঐ গবেষণার পুনরাবৃত্তি করা যায়।

(ঙ) যথার্থতা প্রমাণ : কোনো বৈজ্ঞানিক তার গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করার পর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীগণ তার হুবহু পুনরুৎপাদন করে ফলাফল যাচাই করে দেখতে পারেন, মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য ও যে কোনো মনোবিজ্ঞানী পুনরায় হুবহু পুনরুৎপাদন করে ফলাফল যাচাই করে দেখতে পারেন।

(চ) সাধারণীকরণ : অল্পসংখ্যক দৃষ্টান্ত থেকে সাধারণ সত্যে উপনীত হওয়াকে সাধারণীকরণ বলে। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় গবেষক মানুষ বা প্রাণীর একটি প্রতিনিধিত্বমূলক দলের ওপর গবেষণা করে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সব মানুষ বা প্রাণী সম্পর্কে সাধারণ সূত্র প্রণয়ন করেন।

৩. বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি : বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বলতে বুঝায় পুরনোকে আঁকড়ে ধরে না থেকে নতুনকে স্বাগত জানানো। বিজ্ঞান সর্বদা গতিশীল। তথ্য ও তত্ত্বের পরিবর্তনের সাথে সাথে তাকে গ্রহণ করার মানসিকতা বিজ্ঞানীর থাকতে হবে। মনোবিজ্ঞানীদের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তারা মনোবিজ্ঞানের নতুন নতুন তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কারের সাথে সাথে তা গ্রহণ করছে। 

৪. প্রয়োগশীলতা : বিজ্ঞানের আরেকটি মাপকাঠি হলো এর ব্যবহার বা প্রয়োগ। যে বিষয় বা জিনিস বাস্তবে ব্যবহার করা যায় না তাকে বিজ্ঞান বলা যায় না। মনোবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বা তত্ত্ব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞান; জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্থান কতটুকু তা জানা যায় নিম্নোক্ত আলোচনার মাধ্যমে। মনোবিজ্ঞান মানুষ ও প্রাণীর আচরণ সম্পর্কে গবেষণা করে থাকে। এদিক থেকে মনোবিজ্ঞানকে জীববিজ্ঞানীর একটি শাখা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। জীববিজ্ঞানের প্রতিটা শাখায় জীবের এক একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অধ্যয়ন করা হয়। যেমন- শারীরবিদ্যা জীবন্ত প্রাণীদের শারীরিক গঠন ও কার্য প্রণালি অধ্যয়ন করা হয়, আবার উদ্ভিদবিদ্যায় উদ্ভিদের গঠন ও কার্যাবলির বর্ণনা করা হয়। জীববিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে মনোবিজ্ঞান মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীদের আচরণ সম্পর্কে অধ্যয়ন করে। বিশেষ করে প্রাণীদের আচরণ কিভাবে তার বাইরের পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তা অনুধ্যান করাই মনোবিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য।

প্রত্যেক প্রাণীর যেহেতু একটি জৈবিক সত্তা বা অস্তিত্ব আছে। সেহেতু তার প্রত্যেকটি আচরণ প্রথমত জৈবিক নিয়মের অধীন, যেমন- উদ্ভিদরা সূর্য লোক থেকে খাদ্য প্রস্তুত করে। কিন্তু প্রাণীরা তা পারেনা। সেজন্য প্রাণীদের বাইরের জগৎ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করতে হয়। সুতরাং প্রাণী ও উদ্ভিদের খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কিত আচরণের পার্থক্যর মূল কারণ হলো দৈহিক গঠনের পার্থক্য। তেমনিভাবে মানুষ ও মনুষত্বের প্রাণীর জৈবিক পার্থক্যর জন্যই ঘটে থাকে। 

উপরিউক্ত উদাহরণের আলোকে বলা যায় যে প্রাণীর আচরণসমূহ তার জৈবিক বৈশিষ্টের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের জন্যই যে কোনো শ্রেণির প্রাণীদের আচরণে পার্থক্য দেখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন জৈবিক ঘটনাবলির প্রভাবে একই শ্রেণির প্রাণীর আচরণে ও পার্থক্য সৃষ্টি হয়। প্রাণীর আচরণসমূহ সাধারণত জৈবিক ঘটনাবলির দ্বারা সৃষ্টি হয়। সে জন্য প্রাণীর আচরণসমূহকে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে হলে প্রাণীর জৈবিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে এবং প্রাণীর অভ্যস্ত রীণ জৈবিক প্রক্রিয়াগুলোকে বুঝতে হয়। মনোবিজ্ঞান তাই প্রাণীর জৈবিক অবস্থাগুলো অধ্যয়ন করে। সুতরাং মনোবিজ্ঞানকে নিঃসন্দেহে জীববিজ্ঞানের একটি শাখা বলা যায়। প্রাণীদের আচরণ শুধুমাত্র জৈবিক ঘটনাবলির দ্বারাই প্রভাবিত নয় । পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও প্রাণীদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মানুষ যে সমাজে বাস করে তার ব্যবহার ও মানসিক ক্রিয়া সেই সমাজের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। কোনো সমাজের রীতিনীতি, কৃষ্টি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সে সমাজের মানুষের আচরণ এবং মানসিক ক্রিয়াকে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত করে।

যেমন— আদিম সমাজে কতকগুলো আচরণে গায়ের জোরের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু আধুনিক সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তাই আজকের মানুষের আচরণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একজন মানুষ একাকি যে ধরনের আচরণ করে, দশজনের উপস্থিতিতে সে তা করে না। এমনকি নির্জনেও সে তার সামাজিক মূল্যবোধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। একেক ধরনের সমাজ ব্যবস্থায় একেক ধরনের ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে। সে জন্য মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের আচরণে সামাজিক প্রভাবসমূহ পর্যবেক্ষণ করেন। মনোবিজ্ঞান তাই একাধারে জৈবিক বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান ।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, মানব আচরণ ও কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণে জৈবিক ঘটনাবলি যেমন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তেমনি সামাজিক রীতিনীতি, কৃষ্টি প্রভৃতির ভূমিকাও কোনো অংশে কম নয়। তাই মনোবিজ্ঞানকে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। আরো বলা যায় যে বিষয়বস্তু, গবেষণা পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবহার যোগ্যতার কথা বিবেচনা করে মনোবিজ্ঞানকে নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান বলা যেতে পারে। বিজ্ঞান ও জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানের স্থান অতুলনীয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *