মনোবিজ্ঞানের আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনোগতীয় এবং জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে যা জান লিখ।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং মনোগতীয় এবং জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ বর্ণনা কর।

উত্তর

ভূমিকা: মনোবিজ্ঞান মানুষের আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দিক রয়েছে। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ জীবন পর্যন্ত সকল আচরণের ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে। মনোবিজ্ঞান মানুষ ও প্রাণীর আচরণ নিয়ে আলোচনা করে এবং মানুষের মানসিক দিক নিয়েও আলোচনা করে থাকে। জীবদেহ এবং তার আচরণের অতিরিক্ত মন বা আত্মার কোনো অস্তিত্ব নেই। উদ্দীপক ক্রিয়া করার জন্য জীবদেহে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তাই হলো আচরণ। মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি নঃসমীক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি নামেও পরিচিত।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ : মনোবিজ্ঞানের প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী বিভিন্ন মতামত পোষণ করতেন। মতের ভিন্নতার কারণেই বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটেছে। মনোবিজ্ঞানে যে সকল দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে সেগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আচরণ ও মনোগতিয় দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো। যথা:

আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গি : উণ্ড এর অন্তদর্শন পদ্ধতির প্রতি প্রতিক্রিয়া করতে গিয়ে আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভব ঘটেছে। আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানীরা অনুভব করেন যে অন্তদর্শনের মাধ্যমে চেতনাকে অনুধ্যান করা খুবই অবৈজ্ঞানিক। আচরণবাদীদের মতে মনোবিজ্ঞানকে বিজ্ঞান হতে গেলে অবশ্যই পর্যবেক্ষণযোগ্য বিষয় নিয়ে অনুধ্যান করতে হবে। যেমন— 

আচরণঃ মনোবিজ্ঞান হলো আচরণের বিজ্ঞান এটি আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারীরা মনে করেন। পরিবেশের উদ্দীপক দ্বারা প্রতিক্রিয়া এবং আচরণগত প্রতিক্রিয়া যেভাবে প্রভাবিত হয় আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানীরা তা অনুধ্যান করেন।

১ম ব্যক্তি : প্যাভলভ যে কাজ শুরু করেছিলেন তার মধ্যে আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির মূল নিহিত রয়েছে। প্যাভলভ যদিও প্রাক্তন শারীরবিদ মনোবিজ্ঞানী নন। তার আবিষ্কার মনোবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়। তিনি বলেন- অনুষঙ্গ এবং সাপেক্ষণ হলো মনোবিজ্ঞানের বিষয়।

২য় ব্যক্তি : আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গিতে হয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন থর্নডাইক। থর্নডাইক আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গিতে অবদান রাখেন। থর্নডাইক ১৮৯৮ সালে ২৪ বছর বয়সে শিক্ষণ সম্পর্কিত বিড়াল নিয়ে পরীক্ষণলব্ধ তথ্য সমৃদ্ধ প্রকাশ করেন। তিনি দেখতে পান যে, বিড়ালের যে সকল আচরণকে খাদ্য প্রদান করে পুরস্কৃত করা হয়। একই ধরনের পরিবেশে বিড়ালের ঐ সব আচরণ করার প্রবণতা বেড়ে যায়। আবার যে সকল আচরণকে পুরস্কৃত করা হয়নি সে সকল আচরণ করার প্রবণতা অনেক কমে আসে। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে তিনি ফল লাভের সূত্র প্রণয়ন করেন।

৩য় ব্যক্তি : আচরণগত দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশে ৩য় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হলেন জন. বি. ওয়াটসন। ওয়াটসন প্যাভলভ ও থর্নডাইকের কর্মের দ্বারা উদ্দীপিত হন। ওয়াটসন ১৯১০ সালে আচরণবাদ প্রতিষ্ঠা করেন, ওয়াটসনের মতে মনোবিজ্ঞান থেকে চেতনা অনুধ্যান ও অন্তদর্শন পদ্ধতি সরিয়ে দিতে হবে। এবং পরবর্তীতে তিনি মনোবিজ্ঞানকে আচরণের অনুধ্যান এবং প্রক্রিয়ায় মানুষ ও প্রাণী তার পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে শিখে সে প্রক্রিয়ার বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। ওয়াটসন মনে করেছিলেন যে, প্যাভলভের সাপেক্ষিত প্রতিবর্ত অনুধ্যান এবং থর্নডাইকের বিড়ালের শিক্ষণ উভয়ই ছিল আচরণগত পদ্ধতির বিরাট সাফল্য। আচরণবাদ এমন একটি পদ্ধতি যা বিজ্ঞানসম্মত মনোবিজ্ঞানের পথ উন্মোচন করেছে।

মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গি : মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মূল বিষয় হলো, মানব আচরণ অনুধাবন করার ক্ষেত্রে অবচেতন শক্তির বা মনোগতির ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মনোগতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ফ্রয়েড ও তাঁর অনুসারী নব্য ফ্রয়েডীয়দের কাজের মাধ্যমে।

মনঃসমীক্ষণ শব্দটি তিনি মনোবৈজ্ঞানিক মতবাদসমূহ এবং তাঁর পদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেছেন। ফ্রয়েড এর মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের মূল ধারণা হলো, মানুষ কতকগুলো অবচেতন জৈবিক তাড়না নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যা সব সময় প্রকাশ পেতে সচেষ্ট হয় বা থাকে। ছোট শিশুদের মধ্যে কিছু পরিমাণে তাড়না আছে যা তাদের সামাজিক প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যে আচরণগুলো যথাযথ তা ভাঙ্গতে তাড়িত করে। মনঃসমীক্ষণ তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো, অবদমিত তাড়নাগুলো সব সময় প্রকাশ পেতে বা পরিতৃপ্ত হতে চায়। যে পর্যন্ত না তারা আচরণে প্রকাশ হতে পারছে। পরোক্ষ প্রকাশ হিসেবে তিনি মনে করেন স্বপ্ন, কথা ফসকে বের হওয়া বা স্মৃতি অবদমিত তাড়না।

ফ্রয়েড এর আগ্রহ ছিল মানসিক রোগের বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে। তিনি মানসিক রোগের চিকিৎসার মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা প্রণালি সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন। তাঁর চিকিৎসার উদ্দেশ্য ছিল রোগীকে তার নিজের অবচেতন গতীয় অবস্থা সম্বন্ধে সজাগ করে তোলা। মনের চেতন স্তর ছাড়াও প্রাকচেতন বা অবচেতন এবং নিজ্ঞান স্তর রয়েছে। এরূপ মহাদেশের চেতন স্তরের পরিধি খুবই সামান্য। মনঃসমীক্ষণবাদী ফ্রয়েড এবং তাঁর অনুসারীরা মনে করেন যে, মনের চেতন স্তর নিজ্ঞান স্তরেরই প্রকাশ মাত্র।

জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি : উল্ডের অন্তদর্শনবাদে এবং এর পূর্বে এরিস্টটলের কল্পনা। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীরা জানতে চান, আমরা যা কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করি তা কিভাবে আমরা সংঘটিত করি, মনে রাখি এবং বোঝাতে পারি। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানীগণ মানুষকে তথ্যের চরম সক্রিয় প্রক্রিয়াজাত কারক হিসেবে দেখে থাকেন। জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানী আলরিক নিসার বলেন যে আমরা বাস্তব সম্বন্ধে যা কিছু জানি তা জটিল নিয়ম অনুসারে চলছে যা সংবেদী তথ্যকে ব্যাখ্যা করে এবং পূর্ণ ব্যাখ্যা করে। কিভাবে মানুষ চিন্তার পরিচিত পথ অতিক্রম করে এবং সমস্যার সমাধান আবিষ্কার করে তা জ্ঞানীয় মনোবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।

উপসংহার : মনোবিজ্ঞানের ব্যবহৃত দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। আবার এগুলোর পার্থক্যের কারণেও অনেক সময় নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি হয়ে থাকে। দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর সবগুলোরই কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য থাকে। আচরণ প্রক্রিয়ার মত জটিল বিষয় অনুধ্যানের প্রতিটা দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। মনঃসমীক্ষণ এবং জ্ঞানীয় দৃষ্টিভঙ্গি অন্যতম দৃষ্টিভঙ্গি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *