মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও। মনোবিজ্ঞান হলো জৈব সামাজিক বিজ্ঞান আলোচনা কর।

অথবা, মনোবিজ্ঞানের কি? ‘মনোবিজ্ঞান হলো জৈব সামাজিক বিজ্ঞান ব্যাখ্যা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা: মনোবিজ্ঞান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে আবদ্ধ। কেননা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণকে পরিপূর্ণভাবে বুঝায় এবং অনুধ্যানের জন্য মনোবিজ্ঞানের জ্ঞান অপরিহার্য। মানবীয় বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে মনোবিজ্ঞান বিশেষ ভূমিকা রাখছে। মনোবিজ্ঞানের রয়েছে পরিধিগত বিস্তৃতির ব্যাপকতা।

মনোবিজ্ঞান : Clifford T. Morgan-এর মতে, মানুষ ও প্রাণীর আচরণের বিজ্ঞান হলো মনোবিজ্ঞান, যা মানবীয় সমস্যা অনুধ্যানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।”

রবার্ট এ. ব্যারন এর মতে, “মনোবিজ্ঞান আচরণ এবং জ্ঞানগত প্রক্রিয়া সম্বন্ধীয় বিজ্ঞান।”

রবার্ট এস. ফেল্ডম্যান বলেন, “মনোবিজ্ঞান, আচরণ ও মানসিক প্রক্রিয়ার বিজ্ঞানসম্মত অনুধ্যান।”

মনোবিজ্ঞান হলো জৈব সামাজিক বিজ্ঞান: মনোবিজ্ঞানকে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান বলা হয়। এ বিষয়টি প্রমাণ করার পূর্বে মনোবিজ্ঞান যে একটি যথার্থই বিজ্ঞান সে সম্বন্ধে ধারণা নেওয়া আবশ্যক। নিম্নে জৈব সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে মনোবিজ্ঞানকে তুলে ধরা হলো :

১. বিজ্ঞান : বিজ্ঞান হলো ঘটনা বা বস্তুর সুনিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা-নিরীক্ষালব্ধ জ্ঞান। কোন বিষয় সম্পর্কে সুসংবদ্ধ এর পদ্ধতিগত জ্ঞানই হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হবে জ্ঞানই হচ্ছে বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হবে পর্যবেক্ষণসাপেক্ষ এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে উক্তি হবে প্রমাণযোগ্য। মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু আচরণ, যা অবশ্যই বিজ্ঞানের আওতাভুক্ত। মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে প্রাণীর আচরণকে পর্যবেক্ষণ করেন। তাই মনোবিজ্ঞানকে একটি যথার্থ বিজ্ঞান বলা যেতেই পারে।

২. জৈব বিজ্ঞান : মনোবৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জীবন্ত প্রাণীর আচরণ। জীববিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে মনোবিজ্ঞান মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ অনুধ্যান করে। প্রাণীর আচরণসমূহ তার জৈবিক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। যেমন- মস্তিষ্কের পরিপূর্ণতার ফলে বুদ্ধির বিকাশ ঘটে। হাইপোথ্যালামাস ব্যক্তি আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। নালিহীন গ্রন্থীসমূহ আমাদের দেহে এবং আচরণে পরিবর্তন সৃষ্টি করে। তাই বলা যায়, জৈবিক ঘটনাবলি দ্বারাই প্রাণীর আচরণ সমূহ সৃষ্টি হয়। প্রাণীর আচরণ নিয়ন্ত্রণে জৈবিক বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো- শরীরের গঠন, জৈব রাসায়নিক উপাদান ইত্যাদি।

৩. সামাজিক বিজ্ঞান এছাড়া পারিপার্শ্বিক অবস্থাও প্রাণীর আচরণকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। বন্য প্রাণীরা বাস করে বনে জঙ্গলে আর মানুষ বাস করে একটি সমাজে। মানুষের আচরণও মানসিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে কোন সমাজের রীতি-নীতি, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, আদর্শ ইত্যাদি। সমাজভেদে ব্যক্তির মধ্যে মূল্যবোধ হয়ে থাকে। প্রত্যেক ব্যক্তির আচরণে তার সামাজিক রীতি-নীতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাই মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের আচরণের ওপর সামাজিক প্রভাবসমূহ পর্যবেক্ষণ করেন।

জৈব মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি : মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে; তার মধ্যে জৈব মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্যতম। জৈব মনোবিজ্ঞান মূলত শরীরবিজ্ঞান, মস্তিষ্কের শরীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ, আচরণ এবং মানসিক প্রক্রিয়ার সাথে সমন্বয় করে থাকে। জৈব মনোবিজ্ঞানের মূল বক্তব্য হল যে, প্রতিটি আচরণ চিন্তন ও অনুভূতির সাথে মস্তিষ্কের শারীরবৃত্তীয় ঘটনার সম্পর্ক রয়েছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান একটি যথার্থ বিজ্ঞান। কারণ এটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করে এবং বিজ্ঞানের সব বৈশিষ্ট্য মনোবিজ্ঞানের প্রতিফলিত হয়ে থাকে। প্রাণীর আচরণসমূহ জৈবিক ঘটনাবলি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে মনোবিজ্ঞানকে জৈবিক বিজ্ঞান বলা হয়। আবার মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর আচরণ সামাজিক ঘটনাবলি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে বলে। মনোবিজ্ঞানকে সামাজিক বিজ্ঞানও বলা যেতে পারে। তাই সার্বিক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, মনোবিজ্ঞান একটি জৈব সামাজিক বিজ্ঞান।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *