শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের সাথে অন্যান্য বিজ্ঞানের সম্পর্ক দেখাও।

অথবা, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান কাকে বলে? শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের সাথে অন্যান্য বিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনা কর।

উত্তর : শিক্ষা মনোবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা। এ শাখা সাধারণ মনোবিজ্ঞানের মূলনীতি, তথ্য ও মতবাদসমূহকে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রী এবং বিদ্যালয়ের বাইরের ছাত্র/ছাত্রীদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞান বিশেষত শিক্ষার্থীর উপর অধিক গুরুত্বারোপ করে। এ বিজ্ঞান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষণ প্রক্রিয়া, শ্রেণি কক্ষের পরিবেশ প্রভৃতি বিষয় সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে এবং তথ্যের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে। মূলত শিক্ষা মনোবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানের একটি প্রয়োগিক দিক। এ বিজ্ঞান সাধারণ মনোবিজ্ঞানের মূলনীতি, তথ্য ও তত্ত্বগুলোকে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। নিম্নে কয়েকটি সংজ্ঞা প্রদান করা হলো :

মনোবিজ্ঞানী সি. এইচ. জাড্ বলেন, “শিক্ষা মনোবিজ্ঞানকে এমন একটি বিজ্ঞান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে যা ব্যক্তির জন্ম থেকে পূর্ণতাপ্রাপ্তি পর্যন্ত বিকাশ পর্যায়ের পরিবর্তনের বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করে।”

মনোবিজ্ঞানী বার্ণাড বলেন, “শিক্ষা মনোবিজ্ঞান শিক্ষাক্ষেত্রে সংঘটিত আচরণ অনুধ্যান করে। অর্থাৎ শিক্ষণ এবং শিক্ষাদান সংক্রান্ত বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করে।”

লিন্ডগ্রেনের (১৯৬৭) মতে, “শিক্ষা মনোবিজ্ঞান এমন একটি ফলিত শাখা, যা শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যার সমাধান এবং শিক্ষার কলা-কৌশল ও কার্যক্রম উন্নয়নে মনোবিজ্ঞানের মূলনীতি ও পদ্ধতি প্রক্রিয়া কিভাবে প্রয়োগ করা যায় সে সম্পর্কে আলোচনা করে।”

ডব্লিউ, বি, কেলোসিক বলেন, “শিক্ষা প্রক্রিয়াকে যথাযতভাবে ব্যাখ্যা প্রদান এবং এর উন্নতিকল্পে মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বের শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োগসংক্রান্ত শিক্ষণই হল শিক্ষা মনোবিজ্ঞান।”

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, 

(ক) শিক্ষা মনোবিজ্ঞান একটি ফলিত মনোবিজ্ঞান, 

(খ) এ বিজ্ঞান মানুষের শিক্ষামূলক আচরণ অনুধ্যান করে, 

(গ) শিক্ষণ একটি জীবন ব্যাপি প্রক্রিয়া। সুতরাং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে সকল শিক্ষাই এ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, 

(ঘ) এ শাখা শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা ও সমস্যার সমাধান কল্পে মনোবিজ্ঞানের মূলনীতিসমূহকে প্রয়োগ করে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর বিকাশ সাধন করে থাকে।

এসব বিষয়ের সাথে শিক্ষা মানোবিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনা করা হলো:

(ক) শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও সাধারণ মনোবিজ্ঞান : শিক্ষা মনোবিজ্ঞান মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা। বিশেষত শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ফলিত মনোবিজ্ঞানের একটি শাখা বিশেষ। সাধারণ মনোবিজ্ঞান শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে যেসব তথ্য আবিষ্কার করে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সেসব তথ্য ও তত্ত্বকে ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করে। শিক্ষককে অর্থবহ ও কার্যকর করে তোলার জন্য যেসব তথ্যের প্রয়োজন সেগুলোর আবিষ্কার করাই শিক্ষা মনোবিজ্ঞানের কাজ। অন্যদিকে, শিক্ষা মনোবিজ্ঞানে শিক্ষার সমস্যাগুলোর প্রেক্ষিতে যেসব তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে সেসব তথ্য ও তত্ত্বের ফলে সাধারণ মনোবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক বিদ্যমান। আধুনিক মনোবিজ্ঞান একটি পরীক্ষালব্ধ ও গবেষণাসমৃদ্ধ বিজ্ঞান। গবেষণার মাধ্যমে মানুষের আচরণ সম্বন্ধে যেকোনো তথ্য সংগ্রহে আধুনিক মনোবিজ্ঞানী প্রস্তুত। একইভাবে বলা যায় যে, শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীও শিক্ষার্থী, শিক্ষণ প্রক্রিয়া, শিক্ষণের পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়ের উপর গবেষণা কার্য পরিচালনা করে নতুন নতুন তথ্য সংগ্রহে আগ্রহী। তাছাড়া ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, শিক্ষার্থীর প্রেষণা, আবেগ ও বুদ্ধিমত্তা, শ্রেণিকক্ষের সমস্যা প্রভৃতি বিষয়ের উপর শিক্ষা  মনোবিজ্ঞান গবেষণা পরিচালনা করে থাকে।

উল্লেখ্য যে শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সাধারণ মনোবিজ্ঞান ব্যতীত মনোবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা হতেও তথ্য সংগ্রহ করে; যেমন শিক্ষণের মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান, অস্বভাবী মনোবিজ্ঞান, মানসিক স্বাস্থ্য বিজ্ঞান, সমাজ মনোবিজ্ঞান এবং পরীক্ষণ মনোবিজ্ঞান। পরিশেষে বলা যায় যে, সাধারণ মনোবিজ্ঞানের একজন ছাত্র শিক্ষা মনোবিজ্ঞান সম্বন্ধে প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়; কিন্তু শিক্ষা মনোবিজ্ঞান অনুধ্যানে সে ছাত্র শিক্ষা সংক্রান্ত সমস্যাবলি ও এর সমাধানের ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিণত হয়।

(খ) মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা : মনোবিজ্ঞান একটি আচরণের বিজ্ঞান। আর শিক্ষা হল উন্নত আচরণের বহিঃপ্রকাশ। মানুষের আচরণকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা। ব্যক্তির আচরণকে সুনির্দিষ্ট পথে পরিচালিত করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য। অন্যদিকে মনোবিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হল মানুষের বহুবিধ আচরণকে পর্যালোচনা করা। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কোনো আচরণকে পর্যালোচনা না করে একে কোনোভাবেই শিক্ষা কার্যক্রমের উপযোগী করে তোলা সম্ভব নয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞান একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। ব্যক্তির আচরণের পরিবর্তন সংঘটিত হয় এবং ব্যক্তি শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ অনুমোদিত আচরণ শিখে। শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির আচরণকে একটি প্রত্যাশিত পথে পরিচালিত করা যায়। আর এরূপ কাজে মনোবিজ্ঞান অবশ্যই একটি কার্যকর বিষয়। মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্বের আলোকে ব্যক্তির শিক্ষাকে উন্নত করা সম্ভব।

এমনকি শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নে একজন শিক্ষক মনোবিজ্ঞানের তথ্য ও তত্ত্বের আলোকে কাজ করে থাকেন। মনোবিজ্ঞানে মানব আচরণের সকল দিকই আলোচিত হয়। তাছাড়া, মানুষের আবেগ, ক্রোধ, প্রেষণা, কামনা, মনোযোগ, প্রত্যাক্ষণ, বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব প্রভৃতি বিষয় সম্বন্ধে মনোবিজ্ঞান পাঠে জানা যায় ।

সুইজারল্যান্ডের শিক্ষক পেষ্টালজি সর্বপ্রথম অনুধাবন করেন যে, শিক্ষকরা ছাত্রদের মনোভাব পর্যবেক্ষণ করে বিশেষ জ্ঞানার্জন করেন। তিনি অবশ্য, সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে মনোবিজ্ঞানের নিয়ন্ত্রণাধীন করতে চেয়েছিলেন। তার এ প্রত্যাশা পূরণ না হলেও এ কথা বলা যায় যে শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক সমস্যার সমাধানকল্পে মনোবিজ্ঞান বহু গবেষণা কর্ম পরিচালনা করে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *