শিল্পক্ষেত্রে কর্মী পরামর্শের উদ্দেশ্যাবলী আলোচনা কর।

অথবা, কর্মী পরামর্শের উদ্দেশ্য আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : কর্মী পরামর্শের মূল উদ্দেশ্য হলো একজন কর্মীকে এমনভাবে সহায়তা যেন সে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক দিয়ে নিজেকে কার্যকরীভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। সচরাচর আবেগজনিত বিষয় সফলতার সাথে আয়ত্ত করতে সহায়তা করার জন্য কর্মীর সাথে আলোচান করাকে কর্মী পরামর্শ বলে। কর্মী পরামর্শের মাধ্যমে কর্মীদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়া কর্মী পরামর্শের মাধ্যমে একজন কর্মীকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। শিল্প কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধিতে কর্মীদের সঠিক পরামর্শের মাধ্যমে কর্মে নিয়োজিত রেখে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।

শিল্পক্ষেত্রে কর্মী পরামর্শের উদ্দেশ্যাবলী : ফোর্ড মোটর কোম্পানিতে কর্মীদের জন্য প্রথম শিক্ষা বিভাগের মাধ্যমে কর্মী পরামর্শের প্রবর্তন করা হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কর্মী পরামর্শের প্রয়োগ করতে থাকে। কারণ শিল্প উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শিল্প কর্মী পরামর্শের উদ্দেশ্যাবলী আলোচনা করা হলো ।

১. যথাযথ কর্মী নির্বাচন : শিল্পীর পরামর্শের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত কাজের জন্য উপযুক্ত কর্মী নির্বাচন করা সম্ভব হয়। বিশেষত অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পদোন্নতি বা শূন্য পদে লোক নিয়োগে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী পরামর্শ বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিশেষত যেসব পদের মানুষ মানসিক শ্রমের সাথে যুক্ত তাদের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি।

২. আবেগ নিয়ন্ত্রণ: আবেগ ও যুক্তির ভারসাম্য অবস্থার মধ্য দিয়ে একজন কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের কাজ করতে হয়। কোনো কারণে একজন কর্মী আবেগতাড়িত হয়ে পড়লে কর্মী পরামর্শের মাধ্যমে তার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এতে প্রতিষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় না। আমরা জানি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কার্যক্রমই যৌক্তিক ও পরীক্ষিত সত্য।

৩. দক্ষতা বৃদ্ধি : একজন কর্মীর কাজে ভুলত্রুটি থাকা খুবই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কর্মীকে ভুল সংশোধনের প্রয়োজনী পরামর্শ দিয়ে একজন অদক্ষ কর্মীকে দক্ষ কর্মীতে পরিণত করতে পারে। কর্মী পরামর্শ কর্মীকে সঠিকভাবে কার্য সম্পাদনের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকে।

৪. পেশাগত মূল্যায়ন : কর্মী মূল্যায়ন একটি গতিশীল প্রতিষ্ঠানের জন্য একান্তভাবে অপরিহার্য। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পূর্ব নির্ধারিত পদ্ধতির অভাবে কর্মীকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। এক্ষেত্রে কর্মী পরামর্শ কর্মী মূল্যায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মী মূল্যায়ন উৎপাদনশীলতা কর্মসন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

৫. দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন : একজন কর্মী কর্মক্ষেত্রে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পরিচালিত হয়। কর্মীটি সংকীর্ণ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন হলে কর্মী পরামর্শ তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। সাংগঠনিক উন্নয়নের জন্য দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন একান্তভাবে অপরিহার্য্য। মানুষকে সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন করে তোলাই কর্মী পরামর্শের উদ্দেশ্য।

৬. পরিবেশ উন্নয়ন : প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ যান্ত্রিক উপাদানের চেয়ে মানবিক উপাদান দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। কর্মীরাই প্রতিষ্ঠানের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। কর্মী পরামর্শ এক্ষেত্রে কাজের পরিবেশ উন্নয়নের জন্য কর্মীদেরকে প্রভাবিত করতে পারে। কর্মীদের মনোভাব অনুকূলে এনে কার্য পরিবেশ উন্নত করাই এর উদ্দেশ্য।

৭. ব্যক্তিগত গবেষণা : একক ব্যক্তি হিসাবে একজন কর্মী তার পরিবার ও সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে। সে তার পরিবার ও সমাজের মূল্যবোধকে ধারণ করে এবং সে মূল্যবোধ দ্বারা চালিত হয়। যখন কর্মী প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হয় তখন কর্মী পরামর্শ তাকে সামঞ্জস্য বিধানে সাহায্য করে।

৮. উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি : হতাশাগ্রস্ত কর্মী স্বাভাবিক কারণে একটি প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনশীলতাকে ব্যাহত করে। এইক্ষেত্রে কর্মী পরামর্শক ব্যক্তির সমস্যাগুলো দূর করে তার কর্ম সন্তুষ্টিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলশ্রুতিতে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। শ্রম শক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করাও কর্মীপরামর্শের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য।

৯. শ্রমিক অসন্তোষ হ্রাস: কর্মীপরামর্শের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সব সময়ই কর্মীদের পাশাপাশি থাকে বলে হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানে কোনো বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দোর সম্ভাব্যতা থাকে না। পরামর্শক কমিটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পরামর্শ দিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ দূর করার চেষ্টা করেন।

১০. কর্মসন্তুষ্টি : কর্মীদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি আদায়ের ক্ষেত্রে কর্মী পরামর্শের ভূমিকা অপরিহার্য। কর্মীরা কিভাবে কাজে উৎসাহিত হবে। কিভাবে তাদের স্নায়ুর চাপ কমবে ও হতাশা দূর করা সম্ভব হবে তা পরামর্শের মাধ্যমে করা সম্ভব। এতে কর্মীরা সন্তুষ্ট থাকে।

১১. আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি : আত্মবিশ্বাস একটি মনোবল বৃদ্ধিকরণ উপাদান। আত্মবিশ্বাসহীন কর্মী সংগঠনের লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় না। তাই পরামর্শদানের মাধ্যমে কর্মীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা সহজ হয়। ফলে কর্মী দক্ষতার সাথে কার্য সম্পাদনে সক্ষম হয়। এতে প্রতিষ্ঠান উন্নত কর্মী সেবা লাভের সুযোগ পায় ।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত কর্মীদের মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য কর্মী পরামর্শ চালু রাখতে হয়। একটি প্রতিষ্ঠানের পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন ও কর্মীদের আচরণকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কর্মী পরামর্শের কোনো বিকল্প নেই। এরা কোনোমতে প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশকে উন্নত করে না উপরন্তু কর্মকর্তা কর্মচারীদের কোনো মানসিক সমস্যা দেখা দিলে মানসিক চিকিৎসাও করে থাকে। একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী পরামর্শ একান্ত প্রয়োজন। কর্মীপরামর্শের মাধ্যমে কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়ন করা সম্ভব হয়। কর্মীপরামর্শের মাধ্যমে কারখানার কর্মীদের অসন্তোষ হ্রাস করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *