সাক্ষাৎকার পদ্ধতির সুবিধা/উপকারিতাসমূহ কি কি? এবং সাক্ষাৎকার ও দুর্বল দিকগুলো কি কি? সাক্ষাৎকার পদ্ধতি গ্রহণকারীর গুণাবলি কি কি?

অথবা, সাক্ষাৎকার পদ্ধতির সবল বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : মনোবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু হিসেবে ব্যক্তিত্ব মূল্যায়নকে বা পরিমাপের ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার একটি প্রাচীন পদ্ধতি। বর্তমানে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ সাক্ষাৎকার পদ্ধতি আধুনিককালে এমন একটি মূল্যায়ন পদ্ধতি যার সাহায্যে সাক্ষাৎকার দানকারী ব্যক্তিকে সামনাসামনি উপস্থিত করে কথোপকথনের মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্বের সংলক্ষণগুলোকে সনাক্ত করা হয়। সাক্ষাৎকার পদ্ধতির বিভিন্ন ধরনের সুবিধা রয়েছে। সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর কাছ থেকে তথ্য গ্রহণ করার মাধ্যমে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী অনেক উপকৃত হয়ে থাকে।

সাক্ষাৎকার পদ্ধতি : সাক্ষাৎকার হচ্ছে কথোপকথন উদ্দেশ্যমূলকভাবে করাকে বোঝায় কোনো গবেষণার তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অনুসন্ধানকারী এবং তথ্য প্রদানকারীর মধ্যকার কথোপকথনই সাক্ষাৎকার।

Norman K. Denzin বলেন, “সাক্ষাৎকার হচ্ছে যে কোনো ধরনের মুখোমুখি আলাপ আলোচনা বিনিময় যেখানে একজন আরেকজনের কাছ থেকে তথ্য বের করে আনা।”

Fred N. Kerlinger বলেছেন, “সাক্ষাৎকার পদ্ধতি হচ্ছে মুখোমুখি আন্তঃব্যক্তিক পরিস্থিতি যাতে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ব্যক্তি সাক্ষাৎদানকারী উত্তরদাতা ব্যক্তিকে গবেষণা সমস্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে বিন্যস্ত উত্তর পেতে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার পদ্ধতি “

সুতরাং সাক্ষাৎকার পদ্ধতি হচ্ছে তথ্যবের করে আনার লক্ষ্যে মৌখিক যোগাযোগ কার্য।

সুবিধা: সাক্ষাৎকার পদ্ধতির কতগুলো সুবিধা রয়েছে সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। যথা’

১. প্রয়োগযোগ্যতা : সাক্ষাৎকার পদ্ধতির ব্যাপক প্রয়োগযোগ্যতা রয়েছে। একজন শিশু, নিরক্ষর অন্ধ, ব্যস্ত মানুষ সকালের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে সাক্ষাৎকার পদ্ধতির বেশি প্রয়োগযোগ্যতা।

২. গভীরে প্রবেশ : সাক্ষাৎকার পদ্ধতির অন্যতম আরেকটি সুবিধা হলো যে ব্যক্তির গভীরে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে বা করা যায়। যা অন্য পদ্ধতিতে সম্ভব না। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার প্রদানকারী এবং বেশি কার্যকারিতা রয়েছে। এটি একটি অন্যতম সুবিধা।

৩. নমনীয়তা : সাক্ষাৎকার পদ্ধতির একটি অন্যতম সুবিধা হচ্ছে যে- সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিমাণে নমনীয়তা বিদ্যমান থাকে। এতে অনেকভাবে প্রশ্ন করা যায়, উত্তরদাতার ভিতরে প্রবেশ করা যায় এবং বার বার প্রশ্ন ভাবে সঠিক উত্তর সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় বা সঠিক উত্তর সম্পর্কে নিশ্চিত করা করে তথ্য বের করে আনা সম্ভব হয়।

৪. সঠিক ও নির্ভরযোগ্যতা : সাক্ষাৎকার পদ্ধতির অন্যতম একটি সুবিধা বা উপকারিতা হচ্ছে সঠিক ও নির্ভরযোগ্যতার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা। সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে সংগৃহীত তথ্যের সঠিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা অনেক বেশি। কারণ সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করার সময় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী উত্তরদাতার মনের গভীরতম স্থানে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহ করেন এবং নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে বা প্রয়োগ করে প্রকৃত তথ্য বের করে আনেন।

৫. বহুমুখী কাজ করা যায় : সাক্ষাৎকার পদ্ধতির অন্যতম একটি সুবিধা বা উপকারিতা হচ্ছে যে এই পদ্ধতিতে একসাথে বহুমুখী কাজ করা যেমন একদিকে উত্তরদাতার কাছ থেকে মৌখিকভাবে উত্তর পাওয়া যায় অন্যদিকে তেমনি তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়। অনেক সময় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী উত্তরদাতার আচরণ, ভাবভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করে তার মধ্য থেকে সঠিক উত্তর বের করে নিয়ে আসেন।

৬. প্রয়োজনীয় র‍্যাপোর্ট প্রতিষ্ঠা : সাক্ষাৎকার পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা বা উপকারিতা হচ্ছে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর সাথে প্রয়োজনীয় র‍্যাপোর্ট প্রতিষ্ঠা করা। সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা তথ্য প্রদানে অনিচ্ছুক থাকে । সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে এই ধরনের অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা যায়। কারণ প্রয়োজনীয় র‍্যাপোর্ট প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রেষণাপ্রদান করে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। র‍্যাপোর্ট প্রতিষ্ঠা করে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর কাছ থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সঠিক ও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

৭. জটিল ও দুর্বোধ্য প্রশ্ন করা যায় : এ পদ্ধতিতে জটিল ও দুর্বোধ্য প্রশ্ন ব্যবহার করা যায়। কেননা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী উত্তরদাতার কাছে জটিল প্রশ্নগুলোও সহজভাবে তুলে ধরতে পারে বা ধরা যায়।

৮. দ্রুত তথ্য পাওয়া যায় : দ্রুত তথ্য পেতে সাক্ষাৎকার পদ্ধতি খুবই কার্যকরী একটি পদ্ধতি। যেমন- ডাকযোগে প্রশ্নের উত্তর প্রাপ্তির কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। সেক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার সরাসরি ও দ্রুততার সাথে তথ্য সংগ্রহ করে। এটি সাক্ষাৎকার পদ্ধতির অন্যতম একটি সুবিধা।

৯. পারস্পরিক ভাবের বিনিময় সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ও উত্তরদাতার মধ্যে পারস্পরিক ভাবের বিনিময় হয়। কোনো সমস্যার ব্যাপারে উভয়েই চিন্তাধারার বিনিময় করেন। এর ফলে অনুসন্ধানকারীর চিন্তা ও পরিপুষ্টি লাভ করতে পারে।

১০. প্রতারণার সুযোগ কম : সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে উত্তরদাতার প্রতারণা করার সুযোগ থাকে না। অন্যের সাহায্য নিয়ে প্রশ্নপত্র পূরণ করিয়ে নেয়া যায় না। কারণ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর উপস্থিতিতে উত্তর প্রদান করতে হয়।

১১. পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ : সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত কোনো পরিবেশে করা হয় না। তথাপি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী বিভিন্নভাবে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যেমন- উত্তরদাতার আস্থা প্রতিষ্ঠা, কাঠামোগত প্রশ্নপত্র অনুসরণ ইত্যাদি পদ্ধতিতে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

১২. উচ্চহারে উত্তর লাভ : সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে উচ্চহারে উত্তর লাভ করা যায় এবং নিরুত্তরজনিত সমস্যা অনেক কমানো যায়। কেননা সাক্ষাৎকার দানকারী কোনো উত্তর দিতে না চাইলেও উত্তর বের করে আনেন অনেক কৌশলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী।

গুণাবলি : সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে কতকগুলো গুণাবলির দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে হয়। সে সকল গুণাবলি নিচে আলোচনা করা হলো। যথা:

১. সততা : একজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর অন্যতম গুণ হচ্ছে সততা। একজন সৎ সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীই কেবল গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ও প্রকৃত তথ্য সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারেন।

২. আগ্রহ: সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর আগ্রহ, ইচ্ছা ও আন্তরিকতা সাক্ষাৎকারকে সফল করে তোলে। সাক্ষাৎকারের কাজকে যদি তারা মূল্যহীন মনে করেন বা কাজে বিরক্তি মনে করেন তাহলে তা সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে না। সে জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে তার কাজে আগ্রহ থাকতে হবে।

৩. ব্যক্তিত্ব ও মেজাজ : সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও মেজাজের অধিকারী হতে হয়। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী অতি আগ্রহী হবেন না আবার অতি সামাজিকও হবে না। এ দুটোর মাঝামাঝি অবস্থায় থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে হবে।

৪. বুদ্ধিমত্তা ও শিক্ষা : সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে বুদ্ধিমান ও শিক্ষিত হতে হয়। সাক্ষাৎকারের কাজে পর্যাপ্ত বুদ্ধি মান ও পর্যাপ্ত শিক্ষিত হতে হবে।

৫. ভাষা : সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর ভাষা অবশ্যই সহজ সরল ও সর্বোজনবোধগম্য হতে হবে। সাক্ষাৎকার পদ্ধতিতে ভাষাই হচ্ছে সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম। তবে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর ভাষা সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর কাছে বোধগম্য হতে হবে।

৬. অভিজ্ঞতা : সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর অন্য একটি গুণাবলি হলো অভিজ্ঞতা। প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করার জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে অবশ্যই দক্ষ, অভীক্ষা হতে হবে। অভিজ্ঞতা না থাকলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর মত জটিল কাজ সম্পাদন করা সম্ভব নয়।

৭. চটপটে স্বভাব : একজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে অবশ্যই স্মার্ট হতে হবে। একই সাথে তার কোনো চিন্তা করা এবং কথা বলার যোগ্যতা থাকতে হয়।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, সাক্ষাৎকার পদ্ধতিটি একটি অন্যতম পদ্ধতি। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে কতকগুলো গুণাবলির সমষ্টি হতে হয় যাতে করে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ভালোভাবে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে পারেন এবং তার গুণাবলির উপর ভিত্তি করে সাক্ষাৎকার প্রদানকারী সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদান করে থাকে। সাক্ষাৎকার পদ্ধতি একটি নমনীয় পদ্ধতি । এই পদ্ধতির মাধ্যমে সঠিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। সাক্ষাৎকার পদ্ধতিটি একটি অন্যতম পদ্ধতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *