সামাজিক জরিপ কাকে বলে? জরিপের ধরনগুলো, সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ লিখ

জরিপের বিষয়বস্তু লিখ এবং জরিপের ধরনগুলো ব্যাখ্যা কর।

অথবা, জরিপের বিষয়বস্তু আলোচনা কর।

উত্তর : 

ভূমিকা : জরিপ পদ্ধতিকে একটি ব্যাপক নিরীক্ষণ বলা যায়। কারণ এ পদ্ধতিতে কোনো একটি বিষয় সম্বন্ধে বিপুল সংখ্যক লোকের মতামত ও মনোভাব সহজেই যাচাই করা যায়। জরিপ পদ্ধতিতে সাধারণত লিখিত প্রশ্ন বা মৌখিক প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

জরিপের বিষয়বস্তু : জরিপের বিষয়বস্তুকে সুনির্দিষ্ট করা খুবই কঠিন। কেননা এটি জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যাপকহারে ব্যবহৃত হচ্ছে। মূলত জরিপের বিষয়বস্তু নির্ভর করে কি প্রকৃতির এবং কি ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে তার উপর। নিম্নে জরিপের বিষয়বস্তুকে নিম্নোক্তভাবে উপস্থাপন করা হলো :

১. জনসংখ্যাগত বৈশিষ্ট্যাবলি : একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য যেমন- মানুষের পরিবার, গৃহ নির্মাণ ব্যবস্থা, প্রজনন ক্ষমতা, বৈবাহিক মর্যাদা এবং অনুরূপ বিভিন্ন বিষয় এবং অন্তর্ভুক্ত।

২. সামাজিক কার্যক্রম : জরিপ মূলত জনগোষ্ঠী যা করে অর্থাৎ তাদের ক্রিয়াকলাপ ও আচরণের সঙ্গে জড়িত। এসব আচরণ দ্বারা তাদের পেশা বুঝায় না, বরং তাদের বিনোদন, ভ্রমণ, বেতার শ্রবণ ইত্যাদি বুঝায় ।

৩. সামাজিক পরিবেশ : গবেষণাধীন জনগোষ্ঠীর যাবতীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়সমূহ এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন পেশা, আয় ব্যয়ের ধরন, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি ।

৪. দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা : মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি বলতে জনগোষ্ঠীর আধুনিক জীবনযাত্রা, পরিবার পরিকল্পনা, ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি মনোভাব জরিপের বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে ৷

জরিপের ধরন : জরিপের ধরন বা শ্রেণীবিভাগ নির্ভর করে গবেষণার বিষয়বস্তু এবং তথ্য সংগ্রহ করার ভিত্তিতে। নিম্নে জরিপের শ্রেণীবিভাগ ব্যাখ্যা করা হলো:

১. সাধারণ ও নির্দিষ্ট জরিপ : সাধারণ জরিপ হলো যেখানে জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সাধারণ তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং এর কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে না। যেমন- আদমশুমারি। আর তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জরিপ ব্যবহৃত হয়।

২. শুমারি ও নমুনা জরিপ : গবেষণাধীন সমগ্রকের প্রতিটি এককের কাছ থেকে ‘Census’- এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু নমুনা জরিপে কেবল সমগ্রকের প্রতিনিধিত্বকারী অংশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

৩. নিয়মিত ও অনিয়মিত জরিপ: নিয়মিত জরিপগুলো সাধারণ নির্দিষ্ট বিরতির পর পর অনুষ্ঠিত হয়। যেমনঅর্থনেতিক জরিপসমূহ। ‘Ad-hoc’ বা অনিয়মিত জরিপগুলোকে সাধারণত একবারই করা হয়। এগুলো কোনো অনুকল্প পরীক্ষণ কিংবা কোনো হারানো তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।

৪. প্রাথমিক ও চূড়ান্ত জরিপ : প্রাথমিক জরিপকে ‘pilot-study’ ও বলা হয়। চূড়ান্ত জরিপ প্রাথমিক জরিপ সমাপ্ত হওয়ার পরই সংঘটিত হয়। এর উদ্দেশ্য গবেষণাধীন বিষয় সম্পর্কে পূর্ব ধারণা নেয়া।

৫. ব্যাপক ও সীমিত জরিপ: ব্যাপকভিত্তিক জরিপ বিস্তৃত এলাকা ও বশবিধ উদ্দেশ্য নিয়ে সংঘটিত হয়। আর সীমিত জরিপ নির্দিষ্ট এলাকা ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে সংঘটিত হয়।

৬. অফিসিয়াল আধা-অফিসিয়াল এবং ব্যক্তিগত জরিপ : এ ধরনের জরিপ সাধারণত সরাসরি প্রতিষ্ঠান বা কোনো বিভাগ কর্তৃক সম্পাদিত হতে পারে। আর ব্যক্তিগত জরিপ ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও বেসরকারি সংখ্যা কর্তৃক সংঘটিত হয়ে থাকে।

৭. ডাক ও ব্যক্তিগত জরিপ: ডাকযোগের জরিপগুলো লিখিত প্রশ্নপত্র উত্তরদাতার নিকট প্রেরণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। অপর দিকে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে যে জরিপ চালানো হয় তা ব্যক্তিগত জরিপ।

৮. গোপনীয় ও প্রকাশ্য জরিপ : গোপনীয় জরিপগুলোর তথ্য প্রকাশিত হয় না। কিন্তু প্রকাশ্য বা Public জরিপগুলোর তথ্য প্রকাশিত হয়।

উপসংহার : সর্বশেষে বলা যায় যে, সর্বাধিক নিশ্চিত তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে জরিপ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতির বিষয়বস্তু যেমন ব্যাপক তেমন শ্রেণীবিভাগ। তাই মনোবিজ্ঞানে এই পদ্ধতির গুরুত্বও অপরিসীম।

 

সামাজিক জরিপ কাকে বলে? এই পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ লিখ।

অথবা, জরিপ কি? এই পদ্ধতির উপকারিতা ও অপকারিতার বিশদ বিবরণ দাও।

অথবা, জরিপ বলতে কি বুঝ? এই পদ্ধতির সবল আলোচনা কর ।

উত্তর:

ভূমিকা: প্রতিটা বিজ্ঞানেরই কিছু না কিছু পদ্ধতি রয়েছে। মনোবিজ্ঞানেরই কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করে। জরিপ পদ্ধতি একটি অন্যতম পদ্ধতি। জনমত যাচাইয়ের জন্য জরিপ পদ্ধতি বহুলভাবে ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। সমাজ মনোবিজ্ঞানে জরিপের মাধ্যমে প্রধানত ব্যক্তির মতামত ও আচরণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও চিত্তাকর্ষক তথ্য পাওয়া যায়। এই পদ্ধতির কিছু সুবিধা এবং অসুবিধাও রয়েছে। 

জরিপ পদ্ধতি/ সামাজিক জরিপ : সামাজিক আচরণ অনুসন্ধানের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় তাকে পদ্ধতি বলে। জনমত যাচাইয়ের ক্ষেত্রে জরিপ পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা হয়। জরিপ পদ্ধতিতে সাধারণত লিখিত ও মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে তথ্য জরিপ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

প্রামাণ্য সংজ্ঞা নিয়ে কিছু সংজ্ঞা প্রদান করা হলো : Mark Abram বলেন, “জরিপ এমন একটি প্রক্রিয়া যার দ্বারা একটি সম্প্রদায়ের গঠন ও কার্যাবলি সামাজিক উপাদান সম্পর্কে সংখ্যাগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।”

  1. S. Bogardus বলেন, “জরিপ হচ্ছে জীবনযাপন ও কাজের অবস্থা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে বললে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জনগণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ।”

সুতরাং জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমে একটি সমাজের সকল তথ্য পাওয়া যায়।

সুবিধা: জরিপ পদ্ধতি অন্যতম একটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতির কিছু পরিমাণে সুবিধা রয়েছে। সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। যথা:

১. কম খরচ : জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা যায়। বিশেষ করে, ডাকযোগে প্রেরিত প্রশ্নমালার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ তেমন ব্যয়বহুল নয়।

২. নমনীয়তা : জরিপ পদ্ধতি তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ব্যবহারের অধিক নমনীয়। কেননা এতে পর্যবেক্ষণ, সাক্ষাৎকার, প্রশ্নমালা যে কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।

৩. নির্ভুল সাধারণীকরণ : জরিপ পদ্ধতিতে বৃহদাকৃতির সমগ্রক থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশ বাছাই করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এজন্য এ পদ্ধতিতে সাধারণীকরণ অধিক সঠিক হয়।

৪. উদ্ঘাটনমূলক : জরিপ পদ্ধতি গবেষককে অপ্রত্যাশিত ও অজানা সম্ভাব্য সমস্যা আঁচ করতে পারে বা সহায়তা করে। এ পদ্ধতি উত্তরদাতার সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপনের মধ্য দিয়ে অনেক অজানা তথ্য উদ্ঘাটন করে।

৫. পরীক্ষণের বিকল্প : সামাজিক ক্ষেত্রে পরীক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগের অনেক সমস্যা বিদ্যমান এরূপ ক্ষেত্রে জরিপ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে কাজ করে।

৬. মৌলিক তথ্য : বৃহদাকৃতির যে সমগ্রককে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় না সে সমগ্রক থেকে সহজে মৌলিক তথ্য সংগ্রহ করতে জরিপ পদ্ধতি সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।

৭. পরিবর্তনের ব্যাখ্যা : জরিপে বিভিন্ন চলকের মধ্যকার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা হয়। দীর্ঘদিন যাবৎ অধ্যয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকে বলে সময়ের ব্যবধানে এ সম্পর্ক কিভাবে পরিবর্তিত হয় জরিপ পদ্ধতি সেটাও ব্যাখ্যা করে। এ প্রক্রিয়া মূলত সামাজিক পরিবর্তনে গতিধারা বুঝতে সহায়তা করে।

৮. প্রত্যক্ষ যোগাযোগ : জরিপ পদ্ধতিতে সাধারণত গবেষক ও উত্তরদাতার মধ্যে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এর ফলে অনেক ভ্রান্তি দূর হয়।

৯. অনুমান গঠন: জরিপ পদ্ধতি অনুমান নির্মাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এ পদ্ধতিতে গবেষণার উচ্চতর পর্যায়ে অনুমান যাচাই করা হয়। অনেক সময় এতে নতুন অনুমান নির্মাণ করা হয়।

অসুবিধা : জরিপ পদ্ধতির বহুল পরিমাণে সুবিধা থাকলেও এই পদ্ধতির আবার কিছু কিছু অসুবিধাও রয়েছে। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো। যথা:,

১. সময়সাপেক্ষ: জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। দীর্ঘদিন যাবৎ তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত কর্মীরা তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা ধরে রাখতে পারে না। এতে করে কাজের উপর প্রভাব পড়ে।

২. নমুনাজনিত সমস্যা : জরিপের সাফল্য নির্ভর করে নমুনায়ন পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা সঠিকতার উপর। নির্বাচিত নমুনা যদি প্রতিনিধিত্বশীল না হয় তা হলে ভ্রান্ত ফলাফল প্রদান করতে পারে।

৩. গবেষকের প্রভাব : জরিপ পদ্ধতিতে গবেষকের ইচ্ছা অনিচ্ছা ও মূল্যবোধের প্রভাব গবেষণার ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ গবেষক প্রত্যক্ষভাবে উত্তরদাতার সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং তথ্য সংগ্রহে উত্তরদাতাকে নিজের ইচ্ছার অনুকূলে প্রভাবিত করতে পারে।

৪. দ্রুত পরিবর্তনশীল : জরিপের অনেকগুলো বিষয়ই দ্রুত পরিবর্তনশীল। যে বিষয় নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করলে অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে তা অকেজো হয়ে পড়তে পারে বা পরিবর্তন হয়ে পড়তে পারে।

৫. নমনীয়তার অভাব : অপর্যাপ্ত ও অসম্পূর্ণ গবেষণা নকশার কারণে কিংবা গবেষণা নকশার কোনো পরিবর্তনের ফলে পুরো গবেষণাকেই নতুনভাবে সাজাতে হয়। এ পদ্ধতিতে সংশোধনের কোনো ব্যবস্থা নেই ।

৬. সঠিকতার সমস্যা : যাচাই কেননা তথ্যের সঠিকতা নির্ভর করে তথ্য সংগ্রাহক উত্তরদাতার সততা, আন্তরিকতা এবং পক্ষপাতহীন মনোভাবের উপর।

৭. নমুনাজনিত সমস্যা : জরিপের সাফল্য নির্ভর করে নমুনায়ন পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা ও সঠিকতার উপর। নির্বাচিত নমুনা যদি প্রতিনিধিত্বশীল হয় তাহলে গবেষণার ফলাফল সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। না হলে ভুল হতে পারে।

৮. সাধারণ অধ্যয়ন : জরিপ পদ্ধতিতে অনেকগুলো বিষয়কে সাধারণভাবে অধ্যয়ন করে এবং কোনো বিষয়কে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করে না।

উপসংহার : উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, জরিপ পদ্ধতির সুবিধা থাকার পাশাপাশি অসুবিধা থাকলেও এটি অন্যতম একটি পদ্ধতি। বলা যায় যে জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। জরিপ পদ্ধতি সামাজিক ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জরিপ পদ্ধতি পরীক্ষণ পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে সাহায্য করে থাকে। কম খরচে এই পদ্ধতি পরিচালনা করা যায়। জরিপ পদ্ধতি অন্যতম একটি পদ্ধতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *